মুফতি মাহবুবুর রহমান নোমানি
ইসলামের প্রধান আর্থিক ফরজ জাকাত
জাকাত অর্থ পবিত্রতা ও প্রবৃদ্ধি। জাকাতের দ্বারা ধনীদের ধন ও অন্তর পবিত্রতা লাভ করে এবং আল্লাহ তাতে বরকত দেন। জাকাত ইসলামের প্রধান পাঁচ স্তম্ভের একটি। নামাজ-রোজার মতোই এর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু আমাদের সমাজে বহু মুসলমানকে দেখা যায়, নামাজ-রোজার মতো জাকাতের গুরুত্ব দেয় না। অথচ জাকাত না দেওয়ার ভয়াবহ ক্ষতি কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। পরকালীন ক্ষতি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা স্বর্ণ-রুপা গচ্ছিত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের কঠোর শাস্তির কথা জানিয়ে দিন। সেদিন তা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করা হবে। আর বলা হবে এগুলো হচ্ছে তোমাদের গচ্ছিত সম্পদ। তোমরা এর স্বাদ আস্বাদন করো।’ (সুরা তাওবা : ৩৪-৩৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘যাকে আল্লাহ তায়ালা সম্পদ দান করেছেন, আর সে তার জাকাত আদায় করেনি। কিয়ামত দিবসে তার সম্পদ কালো দাগবিশিষ্ট বিষধর সাপের রূপ ধারণ করে গলা পেঁচিয়ে তাকে অনবরত দংশন করবে আর বলবে, ‘আমিই তোমার সম্পদ। আমিই তোমার সঞ্চয়।’ (বোখারি : ১৩৩৮)
জাকাত অনাদায়ের পার্থিব ক্ষতি সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘স্থলে ও জলে যত সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সবই জাকাত আদায় না করার কারণে। (মাজামউজ জাওয়ায়েদ : ৪৩৩৫)
জাকাত অনাদায়ের এতসব ভয়াবহ পরিণতি সত্ত্বেও বর্তমানে ধনপতিদের চরম উদাসীনতা লক্ষণীয়। আবুবকর (রা.)-এর খেলাফতকালে কতিপয় ব্যক্তি জাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। প্রিয় নবী (সা.) সাহাবাদের বিভিন্ন জিহাদে প্রেরণের সময় বলে দিতেন, ‘তোমরা জিহাদ চালিয়ে যাবে, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনবে, নামাজ পড়বে ও জাকাত দেবে।’ পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে নামাজের পাশাপাশি জাকাতের কথা উল্লিখিত হয়েছে। ওলামায়ে কেরাম বলেন, ‘শারীরিক ইবাদতের মধ্যে নামাজ সর্বশ্রেষ্ঠ আর আর্থিক ইবাদতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে জাকাত।
জাকাত কার ওপর ফরজ
প্রাপ্তবয়স্ক ও বোধশক্তিসম্পন্ন মুসলিম নর-নারী, যার মালিকানায় ঋণ ব্যতীত নিত্যপ্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে এবং সে সম্পদের ওপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হবে, তার ওপর জাকাত ফরজ।
জাকাতের সম্পদ কী কী
জাকাতের সম্পদ চার ধরনের—স্বর্ণ, রৌপ্য, টাকা ও ব্যবসায়িক মাল। স্বর্ণের নেসাব হচ্ছে, সাড়ে সাত তোলা এবং রৌপ্যের নেসাব সাড়ে বায়ান্ন তোলা। আর টাকা ও ব্যবসার মালকে স্বর্ণ বা রৌপ্যের নেসাবের মূল্যের সঙ্গে তুলনা করা হবে। অর্থাৎ কারো কাছে যদি ৭ দশমিক ৫ তোলা সোনা বা ৫২ দশমিক ৫ তোলা রুপার মূল্যপরিমাণ টাকা কিংবা ব্যবসার মাল থাকে, তাহলে তার ওপর জাকাত ফরজ।
সুতরাং যার কাছে শুধু টাকা আছে—সোনা, রুপা ও ব্যবসায়িক মাল নেই, তার টাকা সোনা বা রুপার নেসাব মূল্যপরিমাণ হলে সে নেসাবের মালিক। বছর অতিবাহিত হওয়ার পর তাকে জাকাত দিতে হবে। আর যার কাছে স্বর্ণ, রৌপ্য বা টাকা নেই, কিন্তু তার ব্যবসায়িক মাল আছে। তাহলে সেই মালের মূল্য স্বর্ণ বা রৌপ্যের নেসাব মূল্যপরিমাণ হলে তার ওপর জাকাত আবশ্যক। এমনিভাবে যার কাছে কিছু সোনা, কিছু রুপা এবং কিছু টাকা বা ব্যবসার মাল আছে, সে ক্ষেত্রে সবগুলোর মূল্য স্বর্ণ বা রৌপ্য যে কোনো একটার নেসাব মূল্যপরিমাণ হলে বছর শেষে তার জাকাত দিতে হবে।
জাকাত আদায়ের নিয়ম
যে সম্পদে জাকাত ফরজ হয় তার ৪০ ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ শতকরা আড়াই টাকা হারে জাকাত দেবে। অনেকে সম্পদের পরিপূর্ণ হিসেব না করে অনুমানভিত্তিক কিছু টাকা বা পোশাক জাকাতের নিয়তে দিয়ে থাকেন। এতে জাকাত আদায় শুদ্ধ হবে না।
জাকাতের হিসাবের ক্ষেত্রে চন্দ্রবর্ষ বিবেচ্য। বছরের যেকোনো সময় জাকাত আদায় করা যায়। আমাদের সমাজে সাধারণত রমজান মাসে জাকাত দিতে দেখা যায়। এতে অবশ্য সাধারণের জন্য জাকাতের বছর হিসেব রাখা সহজ। তাছাড়া রমজানের ফরজ ইবাদতের সোয়াব অন্য মাসের ৭০টি ফরজের সমতুল্য, সে হিসেবে রমজানে জাকাত দিলে ৭০ গুণ বেশি সোয়াব পাওয়া যাবে। তবে কারো যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার সর্বপ্রথম তারিখটি নিশ্চিতভাবে জানা থাকে, তার জন্য নির্দিষ্ট তারিখেই জাকাত আদায় করা উচিত।
জাকাত কাদেরকে দেওয়া যাবে
জাকাতের হকদার সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘জাকাত কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত উসুলকারি ও দুর্বল মুসলমানদের চিত্তাকর্ষণের জন্য; দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহ পথের জিহাদকারী ও মুসাফিরদের জন্য। এ হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। (সুরা তাওবা:৬০)। আয়াতে বর্ণিত আট শ্রেণির সারমর্ম হলো—জাকাতের একমাত্র হকদার দরিদ্র, অসহায় ও দুর্বল জনগোষ্ঠী। গরিব আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এবং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত গরিব ছাত্ররা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জাকাত লাভের উপযুক্ত। নিজের ঊর্ধ্বতন আত্মীয় (পিতা-মাতা, দাদা-দাদি) এবং অধস্তন আত্মীয় (সন্তান, নাতি-নাতনি),স্বামী/স্ত্রী, ধনী বা অমুসলিম ব্যক্তিকে জাকাত দেওয়া যাবে না। জাকাতের অর্থের হকদারকে পূর্ণ মালিক বানিয়ে দিতে হবে, যাতে সে স্বাধীনভাবে সেই অর্থ খরচ করতে পারে। তাই কোনো প্রকল্প, বিল্ডিং নির্মাণ, সংস্থা বা জনসেবামূলক কাজে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে না। (রদ্দুল মুহতার : ২/৬৪)
লেখক : মুহাদ্দিস, জামেয়া উসমানিয়া সাতাইশ, টঙ্গী