অনলাইন ডেস্ক
ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত বিধ্বংসী মোড় নিয়েছে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হামলার ধারাবাহিকতায় ইরান এবার তাদের ভাণ্ডারের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিধ্বংসী অস্ত্র ‘খুররমশাহর-৪’ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল প্রয়োগ করেছে বলে দাবি করেছে। শুক্রবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরআইআরজিসি তাদের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ফোর’-এর ১৯তম পর্যায়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এই ভয়াবহ হামলা পরিচালনা করে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল ইসরায়েলের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র তেল আবিব।
বিশেষ করে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর এবং ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর ২৭ নম্বর স্কোয়াড্রন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, ‘ইয়া হাসান ইবনে আলী’ সাংকেতিক নামে পরিচালিত এই অভিযানে খুররমশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।
ইসরায়েলের গর্ব হিসেবে পরিচিত সাত স্তরের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গতিপথ রোধ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে বলে ইরান দাবি করেছে। ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন এবং ভারী এই ক্ষেপণাস্ত্রের সম্মিলিত আক্রমণ তেল আবিবের সুরক্ষা বলয় ভেদ করে শহরজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতের পর ওই এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ও কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে নজিরবিহীন।
খুররমশাহর-৪ বা ‘খাইবার’ ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত ২০২৩ সালে প্রকাশ্যে আনে ইরান। এটি দেশটির অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের দীর্ঘ গবেষণার ফসল। এটি পূর্ববর্তী সংস্করণগুলোর তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন।
প্রায় সাড়ে ১৩ মিটার লম্বা এবং দেড় থেকে দুই টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল হিসেবে পরিচিত হলেও এর ক্ষমতা অনেক দেশের আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সমান।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অবিশ্বাস্য গতি। উৎক্ষেপণের পর এটি শব্দের চেয়ে প্রায় ১৬ গুণ বেশি দ্রুত (ম্যাক ১৬) গতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুটতে পারে। মাত্র ১৫ মিনিটের সংক্ষিপ্ত প্রস্তুতিতেই এটি উৎক্ষেপণ করা যায়। এই মিসাইলের পাল্লা প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো প্রান্ত থেকে ইসরায়েলের যেকোনো স্থানে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে এই অস্ত্রটি।
খুররমশাহর-৪ ক্ষেপণাস্ত্রের আরেকটি মারাত্মক দিক হলো এর মাল্টিপল ওয়ারহেড (একাধিক বোমা) বহনের ক্ষমতা। একটি মাত্র ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ১৮শ’ কেজি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারে। এই বিস্ফোরক লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছালে ৮০টি ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই ক্ষুদ্র ওয়ারহেডগুলো হাইপারসনিক গতিতে নিচে নেমে আসে যা আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারের পক্ষে শনাক্ত করা বা মাঝপথে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব করে তোলে।
হামলার পাশাপাশি আইআরজিসি আরও দাবি করেছে , তারা বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতে অবস্থিত অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও সফল আক্রমণ চালিয়েছে। ১৮তম পর্যায়ের সেই অভিযানে মার্কিন সেনারা তাদের ঘাঁটি ছেড়ে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেসামরিক হোটেলগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে বলে তেহরান দাবি করেছে। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিটি মার্কিন সেনার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনে আরও সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হবে।