মো: আলাউদ্দিন, বিশ্ববিশ্লেষক।
আমেরিকার ‘নেকনজরে’ পড়ে যেসব শাসকের পরিণতি বদলে গেছে
বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ বহুবার শাসনব্যবস্থার গতিপথ পাল্টে দিয়েছে। কখনও গুহা থেকে টেনে বের করা হয়েছে সর্বময় ক্ষমতাধর শাসককে, কখনও আবার রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রাসাদ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে উত্তেজনা ও জল্পনা তৈরি হয়েছে, তা আবারও সেই পুরনো প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—আমেরিকার ‘নেকনজরে’ পড়লে শেষ পর্যন্ত কী পরিণতি হয় ক্ষমতাধর শাসকদের?
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রাজধানী কারাকাস ঘিরে অস্বাভাবিক তৎপরতা, কূটনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার জেরে অনেকেই অতীতের সঙ্গে তুলনা টানছেন। যদিও মাদুরোকে ‘প্রাসাদ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে’—এমন দাবি নিয়ে এখনো স্পষ্ট ও সর্বসম্মত আন্তর্জাতিক নিশ্চিতকরণ নেই, তবে এই জল্পনাই নতুন করে আলোচনায় এনেছে আমেরিকার সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো শাসকদের ইতিহাস।
সাদ্দাম হোসেন: গুহা থেকে পতনের প্রতীক
২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর কয়েক মাস পালিয়ে ছিলেন ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে একটি মাটির নিচের গুহা থেকে গ্রেপ্তার করে মার্কিন বাহিনী। বিচার শেষে তাঁর ফাঁসি হয়। একসময় যিনি ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী শাসকদের একজন, তাঁর পতন আজও আমেরিকার সামরিক শক্তির সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ।
ওসামা বিন লাদেন: প্রতীকী শত্রুর অবসান
আল-কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেন রাষ্ট্রপ্রধান না হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে বড় শত্রু’ হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। দীর্ঘ এক দশকের অনুসন্ধানের পর ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে তিনি নিহত হন। এই অভিযান বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও সামরিক সক্ষমতার এক শক্ত বার্তা দেয়।
মানুয়েল নরিয়েগা: পানামার প্রাসাদ থেকে কারাগার
১৯৮৯ সালে পানামায় মার্কিন সামরিক অভিযানে তৎকালীন শাসক মানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি প্রথমে পালিয়ে ভ্যাটিকানের দূতাবাসে আশ্রয় নিলেও শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য হন। পরে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে মাদক পাচারসহ নানা অভিযোগে বিচার করা হয়।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি: ন্যাটো অভিযানের পরিণতি
লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফির বিরুদ্ধেও সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করলেও ন্যাটোর অভিযানে তাঁর শাসনের পতন ঘটে। ২০১১ সালে বিদ্রোহীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি। গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া আজও স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারেনি।
তাহলে মাদুরোর ভবিষ্যৎ কী?
এই প্রেক্ষাপটেই প্রশ্ন উঠছে—ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ভবিষ্যৎ কোন পথে? তিনি কি কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে টিকে থাকবেন, নাকি সাদ্দাম বা নরিয়েগার মতো পরিণতির মুখোমুখি হবেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, লাতিন আমেরিকার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, রাশিয়া ও চীনের সমর্থন এবং আঞ্চলিক রাজনীতি ভেনেজুয়েলাকে মধ্যপ্রাচ্যের মতো পরিস্থিতিতে ঠেলে দেবে না। আবার অন্যদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ একসময় মাদুরোর ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির কঠিন শিক্ষা
ইতিহাস বলছে, আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো শাসকদের ভাগ্য খুব কম ক্ষেত্রেই সুখকর হয়েছে। তবে প্রতিটি দেশের বাস্তবতা আলাদা, প্রতিটি সময়ের সমীকরণ ভিন্ন।
ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করছে কূটনীতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
একটি বিষয় নিশ্চিত—মাদুরোকে ঘিরে চলমান এই জল্পনা শুধু ভেনেজুয়েলার নয়, বরং গোটা বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।