মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
আরব মরুভূমি এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত এক বিস্তৃত ও বিশাল মরুভূমি অঞ্চল। প্রায় ২৩ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই মরুভূমি আরব উপদ্বীপের বেশির ভাগ অংশ অন্তর্ভুক্ত করেছে। আয়তনের দিক থেকে এটি এশিয়ার বৃহত্তম মরুভূমি এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মরুভূমি আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির পরই যার স্থান। এই মরুভূমির ভূ-প্রকৃতি বৈচিত্র্যে ভরপুর।
কোথাও হালকা বালুকাময় সমভূমি, কোথাও ভাঙাচোরা পাহাড়, আবার কোথাও কালো লাভার বিস্তৃত প্রবাহ ও দিগন্তজোড়া লালচে বালুর টিলায় মরুভূমির রুক্ষ সৌন্দর্য ফুটে ওঠে।
এখানকার আবহাওয়ায় বাতাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাতাস কখনো প্রচণ্ড গরম, কখনো আবার তীব্র শীতল হয়ে ওঠে। ধুলাবালি ও আর্দ্রতা অনেক সময় দৃষ্টিসীমা কমিয়ে দিলেও পরিষ্কার আকাশে সূর্য ও চাঁদের দীপ্ত আলো মরুভূমির নিঃসঙ্গতাকে আরো গভীর ও মহিমান্বিত করে তোলে।
রুবআল খালি বা খালি কোয়ার্টার : বিশ্বের অন্যতম বিস্তৃত ও শুষ্ক মরুভূমি হলো রুবআল খালি, যা দক্ষিণ আরব উপদ্বীপে অবস্থিত এক বিশাল মরুভূমি অঞ্চল। এটি আরব মরুভূমির সর্ববৃহৎ অংশ, যা প্রধানত দক্ষিণ-পূর্ব সৌদি আরবের একটি কাঠামোগত অববাহিকায় প্রায় ছয় লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এর একটি ক্ষুদ্র অংশ ইয়েমেন, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ডের মধ্যেও পড়েছে। খালি কোয়ার্টারকে বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক ও প্রতিকূল পরিবেশের মরুভূমিগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই অঞ্চল প্রায় সম্পূর্ণরূপে জনবসতিহীন এবং দীর্ঘকাল ধরে তা অনেকটাই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।
এখানকার ভূগর্ভে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ। ১৯৪৮ সালে খালি কোয়ার্টার মরুভূমির উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত অঞ্চলে আবিষ্কৃত হয় গাওয়ার তেলক্ষেত্র, যা আজও বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক তেলক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের সীমান্তবর্তী দক্ষিণ-পূর্ব মরুভূমিতে অবস্থিত শায়বা তেলক্ষেত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে এ অঞ্চলে আরো কয়েক বিলিয়ন ব্যারেল তেলের অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। এসব তেলক্ষেত্রের পাশাপাশি এখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ আছে, যা এই মরুভূমিকে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্ব মানচিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
গবেষকদের মতে, এখানে কখনো অগভীর হ্রদ বিদ্যমান ছিল, যা বর্তমান মৌসুমি বৃষ্টির মতোই প্রবল বর্ষণের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল এবং সম্ভবত কয়েক বছর ধরে টিকে ছিল। প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, এসব হ্রদ ছিল নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল। সেখানে পাওয়া জীবাশ্মের অবশেষ বহু প্রাণী প্রজাতির উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে, যার মধ্যে জলহস্তী ও জলমহিষের মতো জলনির্ভর প্রাণীর অস্তিত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ অঞ্চলে অবস্থিত স্নেহা প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র এই প্রাচীন সভ্যতার ধারাবাহিক ইতিহাস উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এখানে পরিচালিত খননকার্যে প্রায় ১২ হাজার বছর আগে প্যালিওলিথিক যুগ থেকে শুরু করে প্রাক-ইসলামিক যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়কালের নিদর্শন ও স্থাপত্য কাঠামো আবিষ্কৃত হয়েছে, বিশেষত সেই সময়ের নিদর্শনগুলোতে সাসানীয় সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক প্রভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, যা এ অঞ্চলের প্রাচীন মানবসভ্যতার সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক ইতিহাসের পরিচয় বহন করে।
আরব মরুভূমির গুরুত্ব : যদিও আরব মরুভূমি বিশ্বের অন্যতম কঠোর ও শুষ্ক মরুভূমি হিসেবে পরিচিত, তবু এর গুরুত্ব অপরিসীম। এর কয়েকটি প্রধান দিক নিম্নরূপ : আরব মরুভূমির বেশির ভাগ অংশে প্রাকৃতিকভাবে স্থায়ী পানির অভাব থাকলেও বালুর নিচে আছে প্রাচীন ভূগর্ভস্থ জলাধার, যা বরফ যুগ থেকে এখানকার বালুর নিচে বিদ্যমান। ইতিহাসজুড়ে এই জল আরব জনগণের জন্য সেচের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করেছে, যা তাদের ফসল চাষ এবং জীবনধারণে সক্ষম করেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মরুভূমিটি উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত, যা সমুদ্রের জলকে পানীয় জলে রূপান্তর করার জন্য আধুনিক ডিস্যালিনেশন প্রযুক্তি প্রয়োগকে সহজ করেছে। শুষ্ক ও কঠোর পরিবেশ সত্ত্বেও আরব মরুভূমি বিশাল তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ধারণ করে। এই সম্পদ আরব বিশ্বের দেশগুলোকে সমৃদ্ধি এনে দিয়েছে এবং তাদের বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল শক্তি কেন্দ্রে পরিণত করেছে। মরুভূমির তেলক্ষেত্র, শোধনাগার ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে। এই তেল রাজস্বের প্রবাহ বিভিন্ন শহর ও দেশগুলোর দ্রুত উন্নয়নকে প্রচণ্ডভাবে এগিয়ে এনেছে, যা আধুনিক আরব বিশ্বের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।