আলেমা হাবিবা আক্তার
মসজিদের সঙ্গে মুসল্লির সম্পর্ক গভীর ও মধুরতম। সে মসজিদেই তাঁর হৃদয়ের প্রশান্তি খুঁজে পায়। কেননা মসজিদ তাঁকে আল্লাহর পথ দেখায় এবং এখানেই সে নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত হয়। এ ছাড়া মুমিন মসজিদকে এই কারণেও ভালোবাসে যে তা পৃথিবীর বুকে মসজিদ আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় স্থান।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হলো মসজিদগুলো আর সবচেয়ে খারাপ জায়গা হলো বাজারগুলো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪১৪)
মসজিদের আহবান
মসজিদের প্রতি যেমন মুমিনের ভালোবাসা আছে, তেমনি এই ভালোবাসার কিছু দাবিও আছে। মুমিন মুসল্লির প্রতি মসজিদের কয়েক দাবি ও আহবান তুলে ধরা হলো।
১. মসজিদ আবাদ রাখা : মুমিনের প্রতি মসজিদের প্রথম ও প্রধান আহবান হলো তা আবাদ রাখা।
মসজিদ আবাদ রাখার দুটি দিক রয়েছে : ক. বাহ্যিক দিক। তা হলো মসজিদ নির্মাণ করা এবং এর অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ করা, খ. ইবাদতের মাধ্যমে মসজিদকে সজীব রাখা। আলেমরা বলেন, উভয় ধরনের আবাদই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমলের মাধ্যমে মসজিদ সপ্রাণ রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মসজিদ আবাদ রাখা মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারাই আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও আখিরাতে এবং নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। অতএব আশা করা যায়, তারা হবে সৎপথপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)
২. মসজিদ পরিচ্ছন্ন রাখা : মুমিনের প্রতি মসজিদের আরেকটি দাবি হলো—মসজিদ, মসজিদের আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) পাড়ায় পাড়ায় মসজিদ নির্মাণ করার এবং তা পরিচ্ছন্ন ও সুগন্ধিময় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৫৫)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক কৃষ্ণকায় নারী মসজিদে নববীতে ঝাড়ু দিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে দেখতে না পেয়ে কয়েক দিন পর তিনি তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। জানানো হলো যে সে মারা গেছে। তিনি বললেন, তোমরা কেন আমাকে অবহিত করোনি? অতঃপর তিনি তার কবরের পাশে আসেন এবং তার জানাজার নামাজ আদায় করেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৫২৬)
৩. পরিচ্ছন্ন হয়ে মসজিদে আসা : মুসল্লির মসজিদের ভালোবাসার দাবি হলো মসজিদে আসার সময় সে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে আসবে, সামর্থ্য অনুসারে উত্তম পোশাক পরিধান করে আসবে। কেননা তা মসজিদের পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আর এটা মহান আল্লাহর নির্দেশও বটে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে বনি আদম! তোমরা প্রত্যেক নামাজের সময় সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করবে, আহার করবে ও পান করবে কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’
(সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩১)
৪. ভক্তি ও ভালোবাসা ধারণ : মসজিদের দাবি হলো, যারা মসজিদে আসবে তারা অন্তরে মসজিদের প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা ধারণ করবে। তারা মসজিদে আগমনকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বাড়ি থেকে পূত পবিত্র হয়ে তারপর কোনো ফরজ নামাজ আদায় করতে হেঁটে আল্লাহর কোনো ঘরে যায় তার প্রতিটি পদক্ষেপের একটি পাপ ঝরে পড়ে এবং অপরটিতে মর্যাদা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।’
(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪০৭)
৫. প্রবেশ, বাহির ও অবস্থানের সুন্নত পালন : মসজিদে প্রবেশ করার ও বের হওয়ার সময় নির্ধারিত সুন্নত পালন করা ও দোয়া পাঠ করা। যেমন—প্রবেশের সময় ডান পা এবং বের হওয়ার সময় বাম পা দেওয়া, ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে প্রবেশ করা, অবস্থানের সময় দুনিয়াবি গল্পগুজব পরিহার করা ইত্যাদি।
৬. সামনের কাতারে বসা : মসজিদের প্রত্যাশা হলো, প্রবেশের পর মুসল্লি সামনে কাতারে খালি স্থানে বসবে। কেননা এতে মসজিদের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশ পায়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যদি জানত, আজান দেওয়া এবং নামাজের প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর মধ্যে কী ফজিলত রয়েছে, তবে তা পাওয়ার জন্য লটারি করত।’
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৬৭১)
৭. দুই রাকাত নামাজ পড়া : মসজিদের প্রবেশের পর সময় থাকলে মুসল্লি দুই রাকাত নামাজ আদায় করবে। যাকে তাহিয়্যাতুল মসজিদ বলা হয়। এই নামাজের মাধ্যমে মসজিদের মর্যাদা প্রকাশ পায় এবং মুসল্লি আল্লাহর দরবারে পুরস্কারের হকদার হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করে, তখন সে যেন দুই রাকাত নামাজ পড়ার আগে না বসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৬৭)
৮. দুর্গন্ধ নিয়ে প্রবেশ না করা : মুমিন দুর্গন্ধযুক্ত খাবার খেয়ে, শরীরে দুর্গন্ধ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করবে না। কেননা এতে মসজিদের পরিবেশের ওপর মন্দ প্রভাব পড়ে এবং আল্লাহর সৃষ্টিরা কষ্ট পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রসুন, পেঁয়াজ ও কুররাস (পেঁয়াজ জাতীয় সবজি) খায় সে যেন আমাদের মসজিদের কাছে না আসে। কেননা মানুষ কষ্ট অনুভব করে থাকে, ফেরেশতারাও কষ্টানুভব করে।
(সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৭০৭)
৯. ডিঙিয়ে সামনে না যাওয়া : সাধারণ নিয়ম হলো যে মসজিদে আগে প্রবেশ করবে সেই মসজিদের সামনের দিকের কাতারে স্থান নেবে। পরে এসে মানুষ ডিঙিয়ে সামনে যাওয়া একটি অপছন্দনীয় কাজ। আবদুল্লাহ বিন বুসর (রা.) বলেন, আমি শুক্রবারে তাঁর পাশে বসা ছিলাম। তারপর তিনি বলেন, এক ব্যক্তি মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে আসছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বললেন, বসে পড়ো, তুমি মানুষকে কষ্ট দিচ্ছ। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১৩৯৯)
১০. খেল-তামাশার জায়গা না বানানো : মুসল্লিদের প্রতি মসজিদের আহবান হলো তাকে যেন খেল-তামাশার জায়গা বানানো না হয়। সাধারণভাবে মসজিদে দ্বিনি কার্যক্রম বৈধ। কিন্তু বিনা প্রয়োজনে তাতে হুজুম করা, হৈচৈ করা এবং খেল-তামাশা ও আনন্দ-ফুর্তির জায়গা বানানো নিষেধ। এটা মসজিদের মর্যাদার পরিপন্থী। মুসল্লিদের প্রতি মসজিদের আহবান হলো তাকে যেন খেল-তামাশার জায়গা বানানো না হয়। সাধারণভাবে মসজিদে দ্বিনি কার্যক্রম বৈধ। কিন্তু বিনা প্রয়োজনে তাতে হুজুম করা, হৈচৈ করা এবং খেল-তামাশা ও আনন্দ-ফুর্তির জায়গা বানানো নিষেধ। এটা মসজিদের মর্যাদার পরিপন্থী। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, কতিপয় আচরণ মসজিদে নিষিদ্ধ। তা হলো মসজিদকে চলাচলের পথ বানানো যাবে না, সেখানে অস্ত্রশস্ত্রের প্রদর্শনী করা যাবে না, তীর, বর্শা বা কামান বহন করা যাবে না, কাঁচা গোশত নেওয়া যাবে না, হদ কার্যকর করা যাবে না, কারো কিসাস কার্যকর করা যাবে না এবং একে বাজারে পরিণত করা যাবে না।
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৭৪৮)