মুফতি সাইফুল ইসলাম
প্রতীকী ছবি
ইসলাম শুধু বিশ্বাসের পরিবর্তনের নাম নয়; এটি মানুষের জীবনদর্শনের আমূল রূপান্তরের নাম। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, অবাধ্যতা থেকে আনুগত্যের দিকে ফিরে আসার এক মহান ঘোষণার নাম ইসলাম।ইসলাম গ্রহণের দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম দয়া ও করুণায় মানুষের অতীতের সকল পাপ ক্ষমা করে ব্যক্তিকে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দেন। যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করে এবং ঈমান ও আমলের সৌন্দর্য রক্ষা করে চলে, তার জন্য অতীতের গুনাহ আর ভবিষ্যতের সওয়াব; উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ।
এই সত্যটি রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ভাষায় উম্মতকে জানিয়ে দিয়েছেন নিম্নোক্ত হাদিসে—
আবু সা‘ঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছেন,
“ إِذَا أَسْلَمَ الْعَبْدُ فَحَسُنَ إِسْلاَمُهُ يُكَفِّرُ اللَّهُ عَنْهُ كُلَّ سَيِّئَةٍ كَانَ زَلَفَهَا، وَكَانَ بَعْدَ ذَلِكَ الْقِصَاصُ، الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِمِائَةِ ضِعْفٍ، وَالسَّيِّئَةُ بِمِثْلِهَا إِلاَّ أَنْ يَتَجَاوَزَ اللَّهُ عَنْهَا ”
‘বান্দা যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ইসলাম উত্তম হয়, আল্লাহ্ তাআলা তার পূর্বের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। অতঃপর শুরু হয় প্রতিফল; একটি পুণ্যের বিনিময়ে দশ হতে সাতশ গুণ পর্যন্ত; আর একটি পাপ কাজের বিনিময়ে ঠিক ততটুকু মন্দ প্রতিফল। অবশ্য আল্লাহ্ যদি ক্ষমা করে দেন তবে তা অন্য ব্যাপার। (বুখারি, হাদিস : ৪১)
হাদিসের ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইসলামের এক অতুলনীয় অনুগ্রহ ও ন্যায়বিচারের ভারসাম্যপূর্ণ নীতির কথা তুলে ধরেছেন।
মানুষ যখন কুফর বা ভ্রান্ত পথ থেকে ফিরে আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ইসলাম যদি কেবল মুখের স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বাস, আমল ও চরিত্রে প্রতিফলিত হয়; অর্থাৎ তার ইসলাম ‘উত্তম’ হয়। তখন আল্লাহ তাআলা তার অতীত জীবনের সব পাপ ক্ষমা করে দেন। এই ক্ষমা সাধারণ কোনো ছাড় নয়; বরং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও দয়ার প্রকাশ, যেখানে ছোট-বড় সব গুনাহই অন্তর্ভুক্ত।
এরপর হাদিসে বলা হয়েছে, ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই বান্দার জীবনে প্রতিদানের অধ্যায় শুরু হয়।
অর্থাৎ এখন থেকে তার প্রতিটি কাজ আল্লাহর নিকট হিসাবযোগ্য হবে। নেক কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার দয়া অত্যন্ত বিস্তৃত। একটি ভালো কাজের প্রতিদান ন্যূনতম দশ গুণ দেওয়া হয়, আর কখনো তা বান্দার ইখলাস, পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুসারে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এতে বোঝা যায়, আল্লাহ তাআলা বান্দাকে উৎসাহিত করেন যেন সে সৎকাজে অগ্রসর হয় এবং কখনো নিরাশ না হয়।
অন্যদিকে, পাপ কাজের প্রতিদান অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত।
একটি গুনাহের শাস্তি তার সমানই নির্ধারিত; এর বেশি নয়। এখানেও আল্লাহর দয়ার দিকটি স্পষ্ট, কারণ তিনি অন্যায়ভাবে শাস্তি বাড়িয়ে দেন না। বরং হাদিসের শেষাংশে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ চাইলে তাঁর অনুগ্রহ, ক্ষমা ও দয়ার মাধ্যমে সেই গুনাহও মাফ করে দিতে পারেন। তখন বান্দার জন্য কোনো শাস্তিই থাকে না।
এই হাদিস থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম পূর্ববর্তী সব গুনাহ মুছে দেয় এবং ইসলাম গ্রহণের পর বান্দাকে একটি নতুন, পরিচ্ছন্ন জীবন শুরু করার সুযোগ দেয়। একই সঙ্গে এতে আল্লাহর রহমত ও ইনসাফ উভয়েরই অপূর্ব সমন্বয় ফুটে উঠেছে। এটি মুমিনকে আশাবাদী করে তোলে, আবার দায়িত্বশীলও করে; যাতে সে ইখলাসের সঙ্গে নেক আমলে অগ্রসর হয় এবং গুনাহ থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক