মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আল্লাহ তাআলার অগণিত ও অসংখ্য নিয়ামতের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এসব নিয়ামতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত হলো মানবদেহের অস্থিসন্ধি।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের প্রতিটি হাতের জোড়ার জন্য তার ওপর সদকা রয়েছে। সূর্য ওঠে এমন প্রত্যেক দিন মানুষের মধ্যে সুবিচার করাও সদকা।
’ (বুখারি, হাদিস : ২৭০৭)।
অর্থাৎ মানুষের প্রতিটি অস্থিসন্ধির ওপর প্রতিদিন সদকা রয়েছে, যা আদায় করতে তার দৈনন্দিন নেক আমলগুলো ভূমিকা রাখে। মানুষের মধ্যে সুবিচার করাও এক ধরনের সদকা।
হাফিজ ইবনু হাজর (রহ.) বলেন, এর অর্থ হলো, প্রতিটি দায়িত্বশীল মুসলমানের শরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধির বিনিময়ে আল্লাহর শুকরিয়া হিসেবে সদকা আদায় করা জরুরি।
কারণ আল্লাহ তাআলা মানুষের হাড়গুলোকে সংযুক্ত করে অস্থিসন্ধি বানিয়েছেন, যার মাধ্যমে সে ধরা ও ছাড়ার মতো সূক্ষ্ম কাজ করতে সক্ষম হয়। এই অস্থিসন্ধিগুলোর অসাধারণ কার্যকারিতার কারণেই এগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা একমাত্র মানুষকেই দেওয়া হয়েছে।
নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে মানুষের উচিত বিভিন্ন নেক আমলে আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামতগুলোর শোকর আদায় করা। এ ব্যাপারে আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক আদম সন্তানকেই ৩৬০টি গ্রন্থিবিশিষ্ট করে সৃষ্টি করেছেন।
অতএব, যে ব্যক্তি ওই সংখ্যা পরিমাণ ‘আল্লাহু-আকবার’ বলবে, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলবে, ‘লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ বলবে, ‘সুবহানাল্লাহ’ বলবে, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলবে, মানুষের চলার পথ থেকে একটি পাথর বা একটি কাঁটা বা একটি হাড় সরাবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে, সে কিয়ামতের দিন এমনভাবে চলাফেরা করবে যে সে নিজেকে ৩৬০ (গ্রন্থি) সংখ্যা পরিমাণ জাহান্নাম থেকে দূরে রাখবে অর্থাৎ বেঁচে থাকবে। আবু তাওবাহ তাঁর বর্ণনায় এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে সে এ অবস্থায় সন্ধ্যা করবে। (মুসলিম, হাদিস : ২২২০)
আল্লামা ইবনু বাজ (রহ.) বলেন, যদি কেউ এই সংখ্যার সমপরিমাণ জিকির ও সৎকর্ম করে, তবে তা তার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হয় এবং তার গুনাহগুলো মাফ হয়।
এখানেই শেষ নয়, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় পরিবারের ওপর মানুষ যে খরচ করে, তাও সদকা হিসেবে পরিগণিত হয়। আবু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য সওয়াবের নিয়তে খরচ করলে তা তার জন্য সদকারূপে গণ্য হবে।
(নাসায়ি, হাদিস : ২৫৪৫)
শুধু তাই নয়, নিয়ত শুদ্ধ হলে আমাদের প্রতিদিনকার ছোট ছোট ভালো কাজকেও মহান আল্লাহ সদকা হিসেবে কবুল করেন। ফলে সেগুলো ইবাদতে পরিগণিত হয়। আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমার হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে তোমার ভাইয়ের সামনে উপস্থিত হওয়া তোমার জন্য সদকাস্বরূপ। তোমার সৎ কাজের আদেশ এবং তোমার অসৎ কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ তোমার জন্য সদকাস্বরূপ। পথহারা লোককে পথের সন্ধান দেওয়া তোমার জন্য সদকাস্বরূপ, স্বল্প দৃষ্টিসম্পন্ন লোককে সঠিক দৃষ্টি দেওয়া তোমার জন্য সদকাস্বরূপ। পথ থেকে পাথর, কাঁটা ও হাড় সরানো তোমার জন্য সদকাস্বরূপ। তোমার বালতি দিয়ে পানি তুলে তোমার ভাইয়ের বালতিতে ঢেলে দেওয়া তোমার জন্য সদকাস্বরূপ। (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৫৬)
বোঝা গেল, প্রতিদিন নিজের ওপর সদকা করার জন্য অসংখ্য অর্থ-সম্পদ থাকার প্রয়োজন হয় না। দৈনন্দিন মানুষের স্বাভাবিক ভালো কাজগুলো সহিহ নিয়তে করলেই সদকার সওয়াব পাওয়া যায়। এমনকি নিজের আচার-আচরণের মাধ্যমে মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকাকেও সদকা হিসেবে গণ্য করা হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমার মন্দ আচরণ থেকে লোকদের মুক্ত রাখবে। এ হলো তোমার পক্ষ থেকে তোমার প্রতি সদকাহ।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৫১)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রতিদিন নিজের ওপর সদকা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।