হাসান ইমন ও তাওসিফ মাইমুন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমঝোতা। নির্বাচনে এনসিপি জোট (এনসিপি ও এবি পার্টি) ৫০ আসন দাবি করলেও জামায়াত ৩০টি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তবে এনসিপি আরও বেশি আসন দাবি করে আলোচনায় রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
গত বুধবার জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এনসিপি নেতাদের বৈঠক হয়।
ওই বৈঠকে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। তবে জামায়াতের সঙ্গে থাকবেন বলে চূড়ান্তভাবে একমত হয়েছেন এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেনসহ শীর্ষ নেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আলোচনায় আমরা একমত হয়েছি। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
প্রক্রিয়া চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ৫০টি আসন দাবি করলেও জামায়াতের পক্ষ থেকে ৩০ আসন দিতে রাজি হয়েছে। তবে আমাদের আরও কয়েকটি আসন লাগবে। সেজন্য এখনো আলোচনা চলছে।
এদিকে আসন সমঝোতা ও জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিষয়ে বিভক্তি দেখা দিয়েছে এনসিপিতে। জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দলটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নেতা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্ত হবে দেশের জনগণের সঙ্গে গাদ্দারি। এতে আপত্তি জানিয়ে নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন এনসিপির ৩০ নেতা। তার ওপর জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে চাচ্ছেন না এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, নুসরাত তাবাসসুম ও তাজনুভা জাবিন, সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা ও নাহিদা সারোয়ার নিভা।
যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদুল হক ও যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ। জোট প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পর এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। এমন ঘোষণা দিয়ে গতকাল রাতে তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এ সময় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানান।
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শুরু থেকে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করার কথা বলে জামায়াতের সঙ্গে জোট করা মানে দেশের মানুষের সঙ্গে বেইমানি করা। এর মধ্যে কয়েক লেয়ারের ইন্টারভিউ করে ১৮০০ মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়েছে। এর মধ্যে যাচাইবাছাইয়ের মাধ্যমে ১২৫ আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা করে এখন আসন সমঝোতা নৈতিকতাবিরোধী। তা ছাড়া জামায়াতের সঙ্গে ৩০ আসনের সমঝোতা হলেও অনেক নেতাই নির্বাচন করতে পারবেন না।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এনসিপির সঙ্গে আসন সমঝোতা খুব ভালোভাবে চলছে। কত আসন ছাড়া হচ্ছে এগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে আশা করি দ্রুতই চূড়ান্ত করা হবে। অন্যদিকে শেষ মুহূর্তে এসে আসন সমঝোতা নিয়ে আট দলের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট লিয়াজোঁ কমিটি দফায় দফায় বৈঠক করেও একক প্রার্থী নির্বাচনে কোনো সমাধানে আসতে পারেনি। প্রতিটি দলেরই আসন চাহিদা অনেক বেশি হওয়ায় এ জটিলতা দেখা দিয়েছে বলে দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে টানাপোড়েন সৃষ্টি হলেও নতুন করে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি আট দলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এ দলগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতার কার্যক্রম চলছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
জানতে চাইলে খেলাফত মজলিশের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, আট দলের আসন সমঝোতা নিয়ে অনেক দূর এগিয়েছি। শেষ মুহূর্তে এসে আসন সমঝোতা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে কিছুটা টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। তবে এই টানাপোড়েন সামনের বৈঠকে শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করছি। আমাদের মধ্যে ঐক্য অটুট রয়েছে। সব দলই চায় ঐক্য টিকিয়ে রেখে নির্বাচনে যেতে। তিনি বলেন, নতুন করে এনসিপি, এবি পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গে আলোচনা চলছে। আশা করছি আসন সমঝোতা হলে এই চার দলও আট দলের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, আসন সমঝোতা নিয়ে অনেক দূর এগিয়েছে। সবশেষ গত বৃহস্পতিবারের আলোচনায় আটকে গেছে। দু- এক দিনের মধ্যে আট দলের লিয়াজোঁ মিটিং হবে। এ বৈঠকে সমাধান হয়ে যাবে।
নাহিদ ইসলামকে এনসিপির ৩০ নেতার চিঠি : জামায়াতে ইসলামীসহ আটদলীয় জোটের সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য। গতকাল গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন তারা। চিঠিতে নেতারা তাদের আপত্তির ভিত্তি হিসেবে এনসিপির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণ অভ্যুত্থান সম্পর্কিত ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার কথা তুলে ধরেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর বিগত এক বছর ধরে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের বিভাজনমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অন্যান্য দলের ভিতরে গুপ্তচরবৃত্তি ও স্যাবোটাজ, এনসিপির ওপর বিভিন্ন অপকর্মের দায় চাপানোর অপচেষ্টা, ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) এবং পরবর্তীতে ছাত্রশক্তি বিষয়ে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার, তাদের অনলাইন ফোর্সের মাধ্যমে এনসিপি ও আমাদের ছাত্রসংগঠনের নারী সদস্যদের চরিত্র হননের চেষ্টা এবং সর্বোপরি ধর্মকে কেন্দ্র করে সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা দেশের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত হয়ে উঠেছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও আমাদের দলের মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। ’ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট এনসিপির নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে বলে চিঠিতে নেতারা উল্লেখ করেন। রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও তারা মনে করেন। চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন- এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, যুগ্ম সদস্যসচিব মুশফিক উস সালেহীন, কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন, যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুম, যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মো. মুরসালীন, সংগঠক রফিকুল ইসলাম আইনী প্রমুখ।