মো: আলাউদ্দিন স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট।
সংগৃহীত ছবি
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। বছরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধানতম লাইফলাইন—চট্টগ্রাম বন্দর—আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। বৈশ্বিক লজিস্টিকস প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানির চাপ সামাল দিতে বন্দরের আধুনিকায়ন এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের কঠিন বাস্তবতা।
দীর্ঘদিনের কাঠামোগত স্থবিরতা, সনাতন ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর যখন বিশ্বমানের প্রযুক্তির পথে হাঁটছে, তখনই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এক মৌলিক প্রশ্ন—এই অগ্রযাত্রা কি আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে?
চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ৩০ বছরের কনসেশন চুক্তিকে কেন্দ্র করে সেই প্রশ্ন এখন নতুন করে আলোচনায়। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেলের আওতায় ‘ডিজাইন, ফাইন্যান্স, বিল্ড অ্যান্ড অপারেট’ কাঠামোতে সম্পাদিত এই চুক্তিতে এপিএম টার্মিনালস বিনিয়োগ করবে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার—বাংলাদেশের বন্দর খাতে যা এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ একক ইউরোপীয় বিনিয়োগ।
সরকারিভাবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না পেলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি বড় বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি পেতে যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগের অঙ্ক যত বড়ই হোক, এর শর্তাবলি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
চুক্তিতে উল্লেখিত সাইনিং মানি হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা এবং প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ২১ থেকে ২৩ মার্কিন ডলার রয়্যালটি রাষ্ট্রের জন্য কতটা লাভজনক হবে—সে প্রশ্নও গুরুত্ব পাচ্ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান আয়ের চেয়ে কোনোভাবেই যেন রাজস্ব কমে না যায়, তা নিশ্চিত করাকে নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্বভৌমত্ব বনাম পরিচালনার এই দ্বন্দ্বে আপসহীন অবস্থান নেওয়াই সময়ের দাবি। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—টার্মিনালটির মালিকানা সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে এবং এপিএম টার্মিনালস কেবল অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। ৩০ বছর শেষে সব অবকাঠামো কার্যকর অবস্থায় সরকারের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি আইনি গ্যারান্টিসহ নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া ট্যারিফ নির্ধারণ, নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং জরুরি জাতীয় স্বার্থে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা যেন কোনোভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে না যায়—এ বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে স্মার্ট পোর্ট, অটোমেশন, এআই-ভিত্তিক লজিস্টিকস ও পেপারলেস ক্লিয়ারেন্স অপরিহার্য হলেও, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ যেন দেশীয় বিশেষজ্ঞদের হাতেই থাকে—এমন তদারকি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে বিদেশি অপারেটরদের স্থানীয় জনবলকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলার বাধ্যবাধকতা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বানও উঠেছে।
বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়তে থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর এখন আর কেবল একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা নয়—এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কারণে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে ‘মাল্টি-অপারেটর’ মডেলে বিনিয়োগ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
নেপাল, ভুটান ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ট্রানজিট ফি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
এ ছাড়া বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল ও অবরোধের ঊর্ধ্বে রাখার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বন্দর একদিন বন্ধ থাকা মানে হাজার কোটি টাকার জাতীয় ক্ষতি—এই বাস্তবতা সামনে রেখে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়ন তখনই সার্থক হবে, যখন তা জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও শ্রমিক কল্যাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। ৩০ বছর পর যখন এই টার্মিনাল রাষ্ট্রের হাতে ফিরে আসবে, তখন যেন সেটি লক্কড়-ঝক্কড় অবকাঠামো নয়, বরং একটি বিশ্বমানের সচল সম্পদ হয়—চুক্তিতে সেই নিশ্চয়তা থাকা অপরিহার্য।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের গৌরব, সক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। আধুনিকায়নের এই যাত্রায় উন্নয়ন হোক দৃশ্যমান, কিন্তু অধিকার থাকুক অটুট—এই প্রত্যাশাই এখন দেশের সচেতন