মিজানুর রহমান বাবুল সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
জ্বালানিনিরাপত্তা যে কোনো দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হলেও দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, আমরা আমাদের দেশের জন্য অপরিহার্য জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। জ্বালানির ব্যাপারে আমরা প্রায় পুরোপুরি বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। তেল সবটাই আমাদানি করতে হয়। গ্যাস আমদানি প্রতিবছরই বাড়ছে। এমনকি বিদ্যুৎও আমদানি করতে হচ্ছে। অথচ, এমনটা হওয়ার কোনো কারণই ছিল না। দেশের মাটির নিচে বড় রকমে গ্যাসের মজুদ আছে, এতথ্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সমীক্ষায় প্রতিভাত হয়েছে। তেলের মজুদও আছে। সাগরে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাসের মজুদ পড়ে আছে। অনুসন্ধান-উত্তোলন ও ব্যবহার হচ্ছে না। এই গ্যাস বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে। শিল্পকারখানায় ও বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যবহৃত হচ্ছে আবাসিক খাতেও। এই গ্যাসের বিভিন্নমুখী ব্যবহারের ফলে গ্যাসের চাহিদা বহুগুণে বাড়লেও গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম মোটেই বাড়েনি। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে দেশি-বিদেশি কোম্পানি অংশ নিয়ে সাফল্য দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানির চেয়ে জাতীয় কোম্পানি বাপেক্সের সাফল্য অনেক বেশি। বাপেক্স নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতায় জর্জরিত। এর উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেয়া হয়নি রহস্যজনক কারণে। ভোলায় গ্যাসের আবিষ্কার বাপেক্স করলেও গ্যাস উত্তোলনের কাজ তাকে দেয়া হয়নি। বিদেশি কোম্পানিকে দেয়া হয়েছে। বাপেক্সকে উন্নত ও লাগসই করা হলে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম যে আরো জোরদার হতো, তাতে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। বিগত স্বৈরাচারের সাড়ে ১৫ বছরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে চরম উপেক্ষা দেখানো হয়েছে। তার বদলে জ্বালানি আমদানিতেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এখাত থেকে কমিশন ও লুণ্ঠনেই ছিল এর পেছনের কারণ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান প্রাথমিক জ্বালানির (গ্যাস) ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। বলেছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। বছরে গড়ে দৈনিক ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমছে। আমরা অনেক চেষ্টা করেও উৎপাদন ধরে রাখতে পারছি না। ঘাটতি মেটাতে এলএনজি আমদানি করছি, যা খুবই ব্যয়বহুল। এলএনজি আমদানির অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
এখন জ্বালানি পরিস্থিতি এতটাই নাজুক ও অনিশ্চিত যে, সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির পথই অনুসরণ করতে হচ্ছে। ইনকিলাবে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, গ্যাস সংকট দূর করতে মহেশখালী-বাখরাবাদ গ্যাস পাইপ লাইনে নির্মাণ করা হচ্ছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। প্রকল্পের কাজ আগামী বছর জুলাইয়ে শুরু হয়ে শেষ হবে ২০৩১ সালের জুনে। উল্লেখ করা যেতে পারে, বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে, যা থেকে প্রতিদিন ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে। আগামী ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দেশে গ্যাস সরবরাহের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে প্রতি বছরই বিশাল পরিমাণ ঘাটতি দেখানো হয়েছে। এখন আমাদের চাহিদা ও সরবরাহের যে পরিস্থিতি, তাতে সংকট কাটানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন না বিশেষজ্ঞরা। গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাণিজ্যিক খাতেও ক্ষতি হচ্ছে এবং আবাসিক চুলা জ্বলছে না। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, দেশের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দাবি করে আসছেন। প্রয়োজনে তারা বাড়তি দাম দিতেও রাজি। কিন্তু তাদের দাবি ও প্রস্তাব রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না সরকারের পক্ষে। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে শিল্পকারখানায় উৎপাদন কম হচ্ছে, রফতানিও কম হচ্ছে। বিনিয়োগ হচ্ছে না। বাড়ছে না কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকছে। ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর এক খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি বিনোয়োগকারীদের বিদেশে বিনিয়োগ বাড়ছে। বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি দেশে বিনিয়োগ করতে ভরসা না পায়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা না পায়, তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে কেন? অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকার ঘটা করে বিনিয়োগ সম্মেলন করলেও বিদেশি বিনিয়োগে তেমন কোনো সাড়া পায়নি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিকাশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য। এর মাধ্যমে উৎপাদন, রফতানি, কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি মানুষের জীবনমানের উন্নতিও হতে পারে, যা আমাদের কাছে পরম আকাক্সিক্ষত। তাই আমাদের সর্ব প্রথমে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়াতে হবে। এজন্য গ্যাস-বিদ্যুতের অবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশীয় উৎসকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজে লাগাতে হবে। জ্বালানির প্রাথমিক উৎসÑ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের ভূগর্ভে ও সাগরে গ্যাসের অপরিমেয় মজুদ আছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তেলেরও মজুদ রয়েছে। আছে কয়লার বিশাল মজুদ। ভূগর্ভের তেল-গ্যাস-কয়লা ব্যবহারে যেমন উদ্যোগের অভাব লক্ষ করা গেছে, তেমনি সাগরের তেল, গ্যাস ও অন্যান্য সম্পদের অনুসন্ধান-উত্তোলনেও পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের মধ্যে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধের অবসান হয়েছে এক যুগেরও বেশি সময় আগে। ইতোমধ্যে মিয়ানমার ও ভারত তাদের সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান চালিয়ে তেল-গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার করেছে। উত্তোলন শুরু করেছে। আমরা কিছুই করতে পারিনি। উত্তোলন তো পরের কথা, জরিপ-অনুসন্ধানও চালাতে পারিনি। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করে তেমন প্রকটা সাড়া মেলেনি। সম্প্রতি আহবান করা দরপত্রে বিভিন্ন দেশের সাতটি কোম্পানি দরপত্রের নথি কিনলেও দরপত্র জমা দেয়নি। বিদেশি কোম্পানিগুলোর এই অনাগ্রহের কারণ কী, তা খতিয়ে দেখার আবশ্যকতা আছে। প্রস্তুত উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) এ জন্য দায়ী কিনা আমাদের জানা নেই। তবে অন্তর্বর্তী সরকার পিএসসি পর্যালোচনার জন্য একটি নতুন কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আর বিলম্ব করার কোনো সুযোগ-অবকাশ আছে বলে আমরা মনে করি না। এ ব্যাপারে ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ-পদক্ষেপ নিতে হবে। পিএসসির ব্যাপারে জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ স্থান দিতে হবে। ভূগর্ভে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানেও জোরালো ভূমিকাও নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যমান জালানি পরিস্থিতির আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে, এটা আমরা প্রত্যাশা করি। সরকারকে এমন একটা অবস্থা রেখে যেতে হবে, যাতে আগামী নির্বাচিত সরকার জ¦ালানির ব্যাপারে যতটা সম্ভব স্বস্তিতে থাকে। বলাবাহুল্য, নির্বাচিত সরকারকে জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিতে উচ্চাগ্রাধিকার দিতেই হবে।