সংবাদ এই সময় অনলাইন।
নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের মুখোশ পরে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনের বুলি আওড়ালেও নেতাদের এমপি-মন্ত্রী হওয়ার লোভাতুর রাজনীতির রূপ-রং কখন পাল্টে যায় আন্দাজ করা সত্যিই দুরূহ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষণে ক্ষণে বদল হচ্ছে দেশের রাজনীতির রূপ, রং ও জোট-ফ্রন্টের বৈচিত্র্য। ‘আল্লাহর আইন কায়েম’ স্লোগান দিয়ে ইসলামী ধারার দল যেমন হিন্দুদের পূজাম-বে ‘গীতা পাঠ’ জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন দাবি করছেন; তেমনি ইসলাম ধর্মের ৫ স্তম্ভের অন্যতম রোজার সঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেবদেবির পূজাকে মিলিয়ে ‘রোজা আর পূজা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ’ প্রচার করছেন। এমনকি একটি দলকে ভোট দিলে বেহেস্তের চাবি নিশ্চিত এমন আজগুবি বক্তব্যও দেয়া হচ্ছে। জাতীয় সংসদে শুধু এমপি হওয়ার লোভে যেমন রাজনৈতিক দল বিলুপ্তি, শীর্ষ পদ থেকে পদত্যাগ করে অন্যদলে যোগদানের ঘটনা ঘটছে; তেমনি শুধু এমপি হওয়ার লোভে বিপরীত আদর্শের দলের সঙ্গে জোট গঠনের ঘটনাও ঘটছে। বিচিত্র কি রাজনীতি! জনগণের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়া লোভাতুর রাজনীতিকদের এই ডিগবাজির সব রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন রেকর্ড করেছে জুলাই অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ কিছু শিক্ষার্থীর নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম নেয়া দলটির কয়েকজন নেতা এমপি হওয়ার লোভে বিপরীত আদর্শের স্বাধীনতা বিরোধীচক্র জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করেছে। ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া অনেক শিক্ষার্থী বলছেন, এমপি হওয়ার লোভে এনসিপির কিছু নেতা জামায়াতের কাছে ‘জুলাই চেতনা’ বিক্রি করে দিল। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যেমন মুক্তিযুদ্ধের ঠিকাদারি নিয়ে নিজেরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করেছে; এনসিপি নেতারাও জুলাই চেতনার ব্যাপারী সেজে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, জসিমসহ ১৪শ’ শহীদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী জোট গঠন গতকাল ছিল টক অব দ্য কান্ট্রি। ভবিষ্যৎ রাজনীতির সম্ভাবনাময় তারুণ্যের শক্তি এনসিপি ‘রাজনীতির নতুন বন্দোবস্ত’ বিসর্জন এবং মধ্যপন্থার গ্রহণযোগ্য রাজনীতি বিসর্জন দিয়ে জামায়াতের পেটে ঢুকে গেল। এমপি হওয়ার লোভ সংবরণ করতে না পেরে নতুন প্রজন্মের এনসিপি বিপরীত চেতনার রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন করে সম্ভাবনাময় রাজনীতির কপালে শেষ পেরেক ঠুকে দিল! জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির নির্বাচনী জোট গঠনের বিরোধিতা করে দলটির প্রভাবশালী কয়েকজন নেত্রী ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন নেতা ইসলামের মুখোশধারী জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা এবং উদ্বেগ প্রকাশ করে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে চিঠি দিয়েছেন। তবে নারী কেলেঙ্কারীর দায়ে অভিযুক্ত দলটির যুগ্ম আহবায়ক সরোয়ার তুষার দাবি করেছেন কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন বিরোধিতা করলেও ১৮৪ জন নেতা জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের পক্ষে মত দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কিংস পার্টি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এনসিপি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে মানুষের এমন প্রত্যাশা ছিল; কিন্তু দল গঠনের পর একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়া সর্বশেষ জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গঠন জামায়াত লাভবান হলেও এনসিপির জন্য আত্মঘাতীর নামান্তর। ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্ম দেশে গঠনে রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করলে জনগণের সাড়া পাবে না।
পরিষ্কার পানি যে পাত্রে রাখা হোক সে পানি ওই পাত্রের রং ধারণ করে থাকে। অন্য রাজনৈতিক দল জামায়াতের সঙ্গে মিলে গেছে সে দল যতই শক্তিশালী হোক জামায়াতের বিলীন হবেই। ইসলামী ধারার রাজনীতির মুখোশে মওদুদীবাদী চেতনা ধারণ করা জামায়াতের পেটেই হয়তো একদিন বিলীন হয়ে যাবে তারুণ্যের সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক দল এনসিপি। প্রতিষ্ঠালগ্নেই এনসিপির কিছু নেতার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ছিল। গণঅভ্যুত্থানে ১৪শ’ ছাত্র-জনতার প্রাণ হারিয়েছে এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী শহীদ হয়। গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও প্রাণ হারায়নি; অথচ এনসিপি গঠনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাইযোদ্ধাদের উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গঠন করে। তখন জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এনসিপিকে বর্জন করে। তারপরও এনসিপি নিয়ে মানুষের মধ্যে আগামীর প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু সে প্রত্যাশাকে ধূলায় মিশিয়ে এমপি হওয়ার লোভে জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছাড়া বাঁধে এনসিপি। অবশ্য এনসিপি নেতারা যুক্তি দিচ্ছেন বিএনপির সঙ্গে এক সময় জামায়াত জোট করে নির্বাচন করেছে; জামায়াতের নেতৃত্বে জোটে এনসিপি গেলে ক্ষতি কী? কিন্তু বাস্তবতা হলেও সত্য যে বিএনপির নেতৃত্বে জামায়াত জোটে গিয়েছিল, লাটাই ছিল বিএনপির হাতে: জামায়াতের জোটে বিএনপি যায়নি। এখন এনসিপি গেল জামায়াতের নেতৃত্বের জোটে, লাটাই জামায়াতের হাতে। বিএনপির একাধিক নেতা জামায়াতের চরিত্র বিশ্লেষণ করে জানান, বিগত ১০ বছর জামায়াত রাজনীতির মাঠে নামতে পারেনি। দলটিকে কার্যত বিএনপি প্রটেকশন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। বিএনপির বদান্যতায় অস্তিত্ব রক্ষা করে জুলাই অভ্যুত্থানের পর জামায়াত নেতারা বিএনপিকে পরামর্শ দেয় বিএনপি যেন জামায়াতকে অনুসরণ করে কার্যক্রম চালায়। বিএনপির গর্ভে থেকে অস্তিত্ব রক্ষাকরা জামায়াত সুযোগ বুঝে বিএনপির রাজনীতি খেয়ে ফেলতে ‘কুমিরীয় চরিত্র’ ধারণ করে। সেই জামায়াতের নেতৃত্বে এনসিপি জোট করলে তারুণ্যের দলটি নিজস্বতাই হারিয়ে ফেলবে। ফলে জামায়াতের জোটে এনসিপি যোগদান জুলাই চেতনার জন্য চরম আঘাত।
জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের বিরোধিতা করে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য দলটির আহবায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছেন, ‘এনসিপির ঘোষিত আদর্শ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক নৈতিকতার সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। গত এক বছরে জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠনের (শিবির) বিভাজনমূলক রাজনীতি, অন্যান্য দলে গুপ্তচরবৃত্তি ও স্যাবোটাজ, এনসিপির ওপর অপকর্ম চাপানোর চেষ্টা, ছাত্ররাজনীতিতে অপপ্রচার এবং নারী সদস্যদের চরিত্রহননের ঘটনা নতুন রাজনীতির পথচলার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে’।
জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার বিরোধিতা করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্ভরযোগ্য মিত্র না। তার রাজনৈতিক অবস্থান বা দর্শনসহ কোনো সহযোগিতা বা সমঝোতায় যাওয়া এনসিপিকে কঠিন মূল্য চুকাতে হবে। তিনি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আসন সমঝোতার প্রসঙ্গ টেনে লিখেছেন, ‘এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি।’ জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির আসন সমঝোতার প্রতিবাদে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন লিখেছেন, ‘এই জিনিস হজম করে মরতেও পারব না আমি।’
এমপি ও মন্ত্রী হওয়ার লোভে বেশ কিছুদিন থেকে এনসিপির কয়েকজন নেতা বিএনপির সঙ্গে জোট গঠনের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রত্যাশিত আসন না পাওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত অন্তর্বর্তী সরকারে জুলাই অভ্যুত্থানের তিনজন তরুণ উপদেষ্টা হওয়ার পর এনসিপি নেতাদের মধ্যে ‘ক্ষমতার লোভ’ পেয়ে বসে। প্রশাসনে নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার-বদলি নানা বাণিজ্য করে ইতোমধ্যে নানা বিতর্কের জন্ম দেন। বিএনপির উপর ভর করে এমপি হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত ৭ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন মিলে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’ জোট গঠন করে। জোটের মুখপাত্র হন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। কিন্তু এই জোটের ব্যানারে নির্বাচন করলে জামানত রক্ষা করা কঠিন। বাস্তবতা বুঝে জোট ভাঙ্গার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিয়েই জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট (তাদের ভাষায় আসন সমঝোতা) করেন এনসিপি। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। জামায়াতের নেতৃত্বে আট দলের সঙ্গে এনসিপি ও এলডিপির যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এলডিপির কর্নেল (অব.) অলি আহমদ সংবাদ সম্মেলনের থাকলেও এনসিপি পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে জোটের আসন সমঝোতার ঘোষণা দেবেন। জামায়াতের অন্য সংগী দলগুলো হচ্ছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। জামায়াতের নেতৃত্বের ১০ দলীয় জোটের শরীক দলগুলো কে কত আসন পাবে সে ব্যাপারে এখনো ঘোষণা দেয়া হয়নি। তবে সূত্রের দাবি ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতার বোঝাপড়া চললেও খেলাফত মজলিস ২, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১০, এলডিপি ৩, এবি পার্টি ৩, ডেভেলপমেন্ট পর্টি ২, জাগপা ৩, খেলাফত আন্দোলন ৪ ও নেজামে ইসলামকে ২ এবং এনসিপিকে ৩০ আসন দেয়া হতে পারে। পরে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন বানচাল করতে আধিপত্যবাদী শক্তি চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় আধিপত্যবাদী শক্তি ঠেকাতে আমাদের বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন। এই ঐক্যের জন্যই জামায়াতসহ সমমনা দলের সঙ্গে ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে’।
বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনীতি করার সুযোগ দেয়ার পর ১৯৭৯ সালে নতুন করে রাজনীতি শুরু করে জামায়াত। এই দীর্ঘ সময়ে বর্তমানে জামায়াত সবচেয়ে ভাল সময় অতিক্রম করছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দলটি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। দলটির নেতারা দিল্লিকে খুশি করতে ‘জামায়াত ভারত বিরোধী নয়’, ‘হাসিনাকে বারবার ফ্যাসিস্ট বলতে ভাল লাগে না’, ‘জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীরা নিজেদের খুশি মতো পোশাক পরে চলাফেরা করতে পারবে’ নানান বক্তব্য দেন। পাশাপাশি জামায়াতের হিন্দু শাখা, পূজা ম-পে গিয়ে গীতা পাঠ, রোজা আর পূজা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠসহ নানা বক্তব্য দেন। এমনকি হিন্দুদের ভোটের জন্য হিন্দু মহাসম্মেলন পর্যন্ত করেন। এসব নিয়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আওয়াজ তোলা হলেও মানুষের মনে জামায়াত তেমন নাড়া দিতে পারেনি। ফলে ইসলামের লেবাসধারী দলটি নির্বাচন পেছানোর দাবি জানান। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা দেয়ার পর দলটি আগে সংস্কার পরে নির্বাচন দাবি করেন। এক সময় ৮ দলীয় জোট গঠন করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি, নভেম্বর মাসের মধ্যেই গণভোট আয়োজন; আগামী জাতীয় নির্বাচনে উভয় কক্ষে বা উচ্চকক্ষে পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি চালু করা; অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) নিশ্চিত করা; ‘স্বৈরাচারের দোসর’ জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে মাঠে নামে। কিন্তু তাদের আন্দোলন মাঠে মারা যায়। মাঠের আন্দোলনে পরাজিত হয়েই নির্বাচনী প্রস্তুতি নেয় দলটি। এ অবস্থায় এমপি-মন্ত্রী হওয়ার লোভাতুর তরুণ নেতাদের নির্বাচনী সমঝোতায় আসন ভাগাভাগিতে রাজী করাতে সক্ষম হন।
অবশ্য প্রচারণা রয়েছে, এনসিপির এই নেতারা জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও এদের অনেকেই গুপ্ত রাজনীতি করতে অভ্যস্ত। জামায়াতের সহযোগী ছাত্র সংগঠন শিবিরের চেতনা লালন করেই বিগত দিনগুলোতে এদের কেউ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের হেলমেট বাহিনী, লাঠিয়াল বাহিনীতে ছিলেন; কেউ বাম ছাত্র সংগঠনের নেতা হিসেবে গুপ্ত রাজনীতি করতেন। ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের পর এনসিপির যে সব সমাবেশ ও কর্মসূচি পালন করে সবগুলোতে জামায়াত ও ছাত্রশিবির জনবল সাপ্লাই দেয়। কিন্তু জামায়াত একাত্তুরে মুক্তিযুদ্ধকে কার্পেটের নীচে চাপা দিয়ে ৫ আগস্টকে সামনে আনার চেষ্টা করায় এনসিপির নেতাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। বেশির ভাগ তরুণ নেতা একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধকে চাপা রাখার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে জামায়াতের ‘একাত্তরকে মুছে ফেলা’র কৌশলের বিরোধিতায় নামে এনসিপি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে গত ২১ অক্টোবর জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার এনসিপির উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা নতুন ছাত্রদের দল। জামায়াতের সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে তোমাদের আরও বহুদূর যেতে হবে। জন্ম নিয়েই বাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ো না’। জামায়াত নেতার ওই বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হলেও এখন পরিষ্কার এনসিপির জামায়াতপন্থী নেতাদের বেশিভাগই যে গুপ্ত শিবির ছিলেন সেটা মিয়া গোলাম পরওয়ার স্মরণ করে দিয়েছেন। এখন জামায়াতের সঙ্গে জুলাই চেতনার ঠিকাদার এনসিপি নেতাদের ঐক্য জুলাই অভ্যুত্থানের অংশ নেয়া ছাত্রজনতাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এমপি হওয়ার লোভে জামায়াতের পেটে জুলাই চেতনার এনসিপির ঢুকে পড়া ’৫২ ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতাদের মুখে কালিমা লেপন করলো।’