মিজানুর রহমান বাবুল সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
বছরের পর বছর ঘুরে আবার আসছে দুহাজার ছাব্বিশ সালের সাধের জানুয়ারি। আর এর আগমনী কর্মকাণ্ডের আওতায় সারা বিশ্বের খ্রিষ্টীয় জগতে না না প্রকৃতির আদলে যীশুর শুভ জন্মদিন তথা বড়দিন বিশেষভাবে উদযাপিত হতে চলেছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। আর আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় ভোটের আমেজের সময়কালের মধ্যেও সাজ-সাজ রব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট উভয়ই সমান তালে চলে থাকে। যাহোক, প্রতিটি খ্রিষ্টান বাড়ির ছাদে তারকা মিটমিট করে দীপ্ত আলোক ছটায় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইংরেজি নববর্ষসহ বড় দিনের আগমনী বার্তা জানিয়ে দিয়ে থাকে এবং একই সাথে যোগ হয় ব্যান্ড পার্টির সানাইয়ের মুহুর্মুহু সুরের মুর্চ্ছনা। তাছাড়া শিশুদের প্রিয় ব্যক্তিত্ব শান্তাক্লজ, ক্রিসমাসট্রি ও কেক সহ উন্নতমানের খাবার আনন্দের পরিধি আরও কয়েকগুন বাড়িয়ে দেয়।
বস্তুত: ৩১ ডিসেম্বর রাতে ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টার ঘর স্পর্শ করতে না করতেই সারা পৃথিবী মেতে ওঠে। আর এই যে আমরা জানুয়ারির প্রথম দিন হিসেবে উদযাপন করে থাকি। অথচ প্রাচীনকালে এ রকম ছিল না। সময়ের ব্যবধানে চরাই উৎরাই পার হয়ে এই অবস্থায় এসে পৌছেছে। আসলে নতুন বছর ১ জানুয়ারি শুরু করার কৃতিত্ব মূলত প্রাচীন রোমানদের। এ পরিপ্রেক্ষিতে যার নাম উঠে আসে, তিনি হলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মহাপরাক্রমশালী রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার। তিনিই অনুধাবন করেন যে, রোমান ক্যালেন্ডারটি ত্রুটিপূর্ণ। কেননা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে এর মিল নেই। আর এই জটিলতা দূর করার জন্য তিনি সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করেন। আর তাদের সাথে বিভিন্ন আঙ্গিকে ইতি ও নেতিবাচক বিষয় আলোচনা করে ৪৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে চালু করেন সৌর ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’। যেভাবেই বলি না কেন, জুলিয়াস সিজারই প্রথম সিদ্ধান্ত নেন বছর শুরু হবে জানুয়ারি মাস থেকে। অবশ্য এ মাসটির নামকরণ করা হয়েছিল রোমান দেবতা ‘জানুস’-এর নামানুসারে। মজার ব্যাপার হলো যে, জানুস ছিলেন দুই মুখবিশিষ্ট এক দেবতা। তার একটি মুখ অতীতের দিকে তাকানো এবং অন্যটি ভবিষ্যতের দিকে। এক্ষেত্রে বছরের শুরুতে মানুষ যেভাবে পেছনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে আগায়; জানুস ছিলেন ঠিক তারই প্রতীক (ঝুসনড়ষ)। এর মধ্যে কালের পরিক্রমায় শতাব্দির পর শতাব্দি পার করে ১৫৮২ সালে এসে দাঁড়ায়। তখন উদ্ভুত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে আরও সংশোধন ও পরিমার্জন করেন। আর তাই তার নামানুসারে তখন এটির নাম হয় গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার। সে সময় থেকে এ ক্যালেন্ডারেই ১ জানুয়ারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বছরের প্রথম দিন হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠা পায়, যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও সমাদৃত। অথচ অন্য কোন সৌর বছর তেমনটি নয়।
সংগত কারণেই যদি জানুয়ারির শুরু বিশ্লেষণ করি, তাহলে প্রতীয়মান হয় যে, পৃথিবী এ সময় সূর্যের সব থেকে কাছাকাছি অবস্থানে থাকে। এ ছাড়া উত্তর গোলার্ধে শীতের তীব্রতা কাটিয়ে যখন দিনের দৈর্ঘ্য বাড়তে শুরু করে, তখন থেকেই নতুন বছর শুরুর একটি প্রাকৃতিক সংকেত পাওয়া যায়। তাছাড়া প্রাচীনকালে কৃষিপ্রধান দেশে ফসলের চক্র অনুযায়ী বছরের হিসাব করা হতো বিধায় সিজার ও গ্রেগীর সংস্কারে এটিকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও ধর্মীয় রূপ দেয়ার পথ সুগম করে। তবে আশ্চার্য হলেও সত্য যে, একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ইংল্যান্ড এবং এর উপনিবেশগুলোয় নতুন বছর শুরু হতো ২৫ মার্চ থেকে। আর একে ‘লেডি ডে’ বলে অভিহিত করা হতো। তৎপর খ্রিষ্টয় ধর্মীয় বিশ্বাস বিবেচনায় এনে ১৭৫১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এক আইন পাসের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ১ জানুয়ারিকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে গ্রহণ করে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, বিশ্বে অনেক ধরনের সাল ব্যবহার হয়ে থাকে। আর এর কিছু সৌর বছর এবং কিছু চান্দ্র বছর ভিত্তিক। তবে এ বিশ্বের ছোট বড় ২৩০টি দেশের মধ্যে অধিকাংশই সৌর জুলিয়ান ও গ্রেগীয় ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে থাকে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, এই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জানুয়ারি প্রথম দিন নববর্ষ হিসেবে বরণ করে নেওয়ার পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন রকম। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, এ ব্যাপারে স্প্যানিশদের মধ্যে একটি মজার ঐতিহ্য হলো রাত ১২টার ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি ঘণ্টার ধ্বনিতে একটি করে মোট ১২টি আঙুর খাওয়া। আর যদি কেউ ১২ সেকেন্ডের মধ্যে ১২টি আঙুর খেতে পারেন, তাহলে বিশ্বাস করা হয় যে, বছরটি খুব ভালভাবে কাটবে। আর সুইজারল্যান্ডের মানুষ মেঝেতে একদলা হুইপড ক্রিম বা ফেনা ফেলে রাখে। এক্ষেত্রে বিশ্বাস যে, এতে ঘরে সমৃদ্ধি এবং ধন-সম্পদ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাবে। এদিকে স্কটল্যান্ডে নববর্ষের সকালে ‘ফার্স্ট ফুটার’ বা বাড়ির আঙিনায় প্রথম যে ব্যক্তি আগমন করবেন, তার গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা ঐতিহ্যগতভাবে এই মর্মে বিশ্বাস করা হয় যে, লম্বা এবং কালো চুলের কোনো পুরুষ যদি প্রথম বাড়িতে প্রবেশ করেন, তবে সেই বছরটি খুব সৌভাগ্যের হবে। আর সবচেয়ে মজার ঘটনা হলো যে, কলম্বিয়া, বলিভিয়া, আজেন্টিনা এবং ইতালির ক্ষেত্রে। এই সব দেশে অন্তর্বাসের রঙের ওপর ভিত্তি করে ভাগ্য নির্ধারিত হয়। এ সূত্র ধরে উল্লেখ্য যে, কলম্বিয়ানরা বিশ্বাস করেন, নতুন বছরের শুরুতে হলুদ রঙের অন্তর্বাস পরলে সারাবছর রোমান্টিক এবং সুখে থাকা যায়। এদিকে ইতালি এবং আর্জেন্টিনায় গোলাপি রঙের অর্ন্তবাসের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। এতদ্ব্যতীত জাপানের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোয় নতুন বছরের শুরুতে ১০৮ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। এক্ষেত্রে মনে করা হয়, মানুষের যে ১০৮টি মানবিক পাপ বা কামনার প্রতীক, তা ঘণ্টা ধ্বনির মাধ্যমে মুছে ফেলে নতুন করে শুদ্ধ হওয়ার সংকল্পপূর্বক নতুন বছরে আগমনের পথ সুগম করে থাকে। এদিকে সাইবেরিয়া বা রাশিয়ার কিছু অংশে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যেও হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় বরফ পানিতে ঝাঁপ দিয়ে নতুন বছর শুরু করা হয়। আর এটি নাকি নতুন জীবনের বা নতুন করে জন্ম নেওয়ার পদ্ধতি বা প্রতীক বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আমেরিকার ক্ষেত্রে আলাদা। এক্ষেত্রে আমেরিকায় টাইমস স্কোয়ারে ‘বল ড্রপ’ দেখা এবং ঠিক ১২টার সময় একে অপরকে চুম্বন করার পাশাপাশি ‘আউল্ড ল্যাং সাইন’ নামক একটি ঐতিহ্যবাহী স্কটিশ গান গাওয়ার প্রচলন রয়েছে। আর এর মূল কথা হলো- পুরোনো সব স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে বন্ধুত্বের বন্ধনে নতুনের আদলে আবদ্ধ হওয়া।
পরিশেষে বলতে চাই, এ বিশ্বের নানা দেশে ১ জানুয়ারি যে ভাবেই পালন করা হোক না কেন; এই জানুয়ারি মাসের ঝরণা-ধারার মূল্যবোধ ঘিরে স্বার্থপরতা ছেড়ে ক্ষমা ও ঘনিষ্ঠতা তথা হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সমঝোতামূলক মনোভাব নিয়ে কাছে টেনে নিলে হয়তো দেশের এই হানাহানি সহজে তিরোহিত হবে। না হবে এতো রক্তপাত; ধ্বংস হবে না দেশের সম্পদ; পাচার হবে না লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা এবং হবে না ফেসবুক ও ইউটিউবে নেতিবাচক ও বানোয়াট খবরের ছড়াছড়ি। আর নববর্ষের প্রথম দিন তথা ১ জানুয়ারি উপলক্ষে আমরা যেন একে অন্যের মর্যাদা দিই। আর কাকেও খাটো করে দেখার কোন কারণ নেই এবং আমরা যেন মূল্যবোধের আবর্তে সবার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধাশীল হই। ১ জানুয়ারি কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি মানসিক পরিবর্তনের লগ্ন। এটি অতীতের গ্লানি ভুলে নতুন উদ্দীপনায় জেগে ওঠার একটি বিশ্বজনীন মুহূর্ত। আর সেই সম্রাট জুলিয়াস সিজার ও গ্রেগরী থেকে শুরু করে আজকের এই অত্যাধুনিক যুগের প্রতিটি মুহূর্তের আড়ালে মানুষ চায় নতুনের নির্মল সূচনা, যা বয়ে আনবে মানব কল্যাণ। আর মানবকল্যাণকে ঘিরে ১ জানুয়ারির এই নতুন সরণির দিগন্ত সৃষ্টি করবে মর্মে বিশ্বাস করি আমরা বাংলাদেশি সহ বিশ্বের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ।