ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
সুরা আত-তীনের ৪নং আয়াতের ক্যালিগ্রাফি। ছবি: সংগৃহীত
মানুষ যখন নিজের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করে, তখন এক অনিবার্য প্রশ্ন সামনে আসে—এই নিখুঁত দেহ, এই ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী, এই সুবিশাল আকাশ— এসব কিছুর পরিকল্পনাকারী কে? ইসলাম অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়। মানুষ ও সমগ্র জগতের সৃষ্টি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি মহান আল্লাহর সুচিন্তিত, সুন্দর ও নিখুঁত পরিকল্পনার ফল। কুরআন আমাদের সেই সত্যের দিকেই বারবার আহ্বান জানায়।
মানুষের সৃষ্টি ও বিশ্বব্যবস্থায় আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনা
আল্লাহ তাআলা মানুষকে শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি; বরং মানুষের বসবাসের জন্য পৃথিবীকে করেছেন স্থিতিশীল, আকাশকে করেছেন সুরক্ষিত ছাদ এবং মানুষকে দিয়েছেন সর্বোত্তম আকৃতি। এ নিখুঁত পরিকল্পনার কথা মহান আল্লাহ তাআলা এভাবে তুলে ধরেছেন—
اَللّٰهُ الَّذِيۡ جَعَلَ لَكُمُ الۡاَرۡضَ قَرَارًا وَّالسَّمَآءَ بِنَآءً وَّصَوَّرَكُمۡ فَاَحۡسَنَ صُوَرَكُمۡ وَرَزَقَكُمۡ مِّنَ الطَّيِّبٰتِ ۚ ذٰلِكُمُ اللّٰهُ رَبُّكُمۡ ۚ فَتَبَارَكَ اللّٰهُ رَبُّ الۡعٰلَمِيۡنَ
‘আল্লাহ, যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে স্থিতিশীল করেছেন, আসমানকে করেছেন ছাদ, তোমাদের আকৃতি দিয়েছেন অতঃপর তোমাদের আকৃতিকে করেছেন সুন্দর (নিখুঁত) এবং তোমাদেরকে পবিত্র বস্তু থেকে রিজিক দান করেছেন। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। সুতরাং সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ কতই না বরকতময়!’ (সুরা আল-মুমিন/গাফির: আয়াত ৬৪)
কুরআনুল কারিমের এই আয়াতে মহান আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দেন— মানুষের শারীরিক সৌন্দর্য, পৃথিবীর ভারসাম্য ও জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ আল্লাহরই নেয়ামত।
মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে সর্বোত্তম আকৃতিতে
মানুষকে আল্লাহ এমন এক নিখুঁত অবয়বে সৃষ্টি করেছেন, যা অন্য কোনো সৃষ্টির মধ্যে নেই। চিন্তা করার ক্ষমতা, অনুভূতি, বিবেক ও আত্মিক সৌন্দর্য— সব মিলিয়ে মানুষ নিখুঁত ও অনন্য। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِيۡۤ اَحۡسَنِ تَقۡوِيۡمٍ
‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম অবয়বে।’ (সুরা আত-তীন: আয়াত ৪)
এটি প্রমাণ করে যে, মানুষের সৃষ্টি কোনো ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা নিয়ে হয়নি; বরং এটি মহান আল্লাহর পরিপূর্ণ ও নিখুঁত পরিকল্পনার বহিঃপ্রকাশ।
হাদিসে মানুষের সৃষ্টি ও মর্যাদা
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে আল্লাহর এক বিশেষ সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন—
إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ آدَمَ عَلَى صُورَتِهِ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদমকে তার নির্ধারিত আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন।’ (মুসলিম- নেকি ও আত্মীয়তা এবং আদব অধ্যায়, তাফসিরে আহসানুল বয়ান)
এ হাদিস মানুষের সম্মান ও মর্যাদার প্রতি ইসলামের গভীর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে।
রিজিক ও জীবন ব্যবস্থায় আল্লাহর অনুগ্রহ
মানুষের জীবনের প্রতিটি প্রয়োজন— খাদ্য, পানি, আলো ও বাতাস— সবই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পক্ষ থেকে পবিত্র রিজিক হিসেবে নির্ধারিত। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا مِنۡ دَآبَّةٍ فِي الۡاَرۡضِ اِلَّا عَلَى اللّٰهِ رِزۡقُهَا
‘পৃথিবীতে বিচরণকারী কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিক আল্লাহর দায়িত্বে নয়।’ (সুরা হুদ: আয়াত ৬)
মানুষ তার সৃষ্টির মতোই তার রিজিকের ক্ষেত্রেও মহান আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত।
মানুষের সৃষ্টি, সৌন্দর্য, জীবনব্যবস্থা ও রিজিক— সবকিছুই মহান আল্লাহর নিখুঁত ও করুণাময় পরিকল্পনার ফল। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করলে মানুষের হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা জন্ম নেয়, অহংকার ভেঙে যায় এবং রবের প্রতি আনুগত্য বৃদ্ধি পায়। সত্যিই সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ কতই না বরকতময়! আসুন, আমরা আমাদের সৃষ্টিকর্তাকে চিনি, তার নেয়ামতের শোকর আদায় করি এবং তার নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করি।