ইসলামী জীবন ডেস্ক
প্রতীকী ছবি
কোরআনুল কারিমের অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
সুরা : বনিইসরাঈল, আয়াত : ৪
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
وَ قَضَیۡنَاۤ اِلٰی بَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ فِی الۡكِتٰبِ لَتُفۡسِدُنَّ فِی الۡاَرۡضِ مَرَّتَیۡنِ وَ لَتَعۡلُنَّ عُلُوًّا كَبِیۡرًا ﴿۴﴾
সরল অনুবাদ
(৪) আর আমি কিতাবে বানী ইস্রাঈলকে জানিয়েছিলাম যে, নিশ্চয়ই তোমরা পৃথিবীতে দু-দুবার বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমরা অতিশয় অহংকারস্ফীত হবে।
সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা
কোন কোন মুফাস্সিরের মতে সুরা বনিইসরাঈলের এই আয়াতে কিতাব বলতে এমন কিতাব বুঝানো হয়েছে। যার মাধ্যমে বনী ইসরাঈলকে এ বিষয়ে আগাম জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখানে قَضَيْنَا শব্দের অর্থ হবে, ফয়সালা জানিয়ে দেয়া, খবর দেয়া।
(আত-তাফসীরুস সহীহ) এ অর্থে কুরআনের অন্যান্য স্থানেও এ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। বলা হয়েছে, (وَقَضَيْنَا إِلَيْهِ ذَٰلِكَ الْأَمْرَ أَنَّ دَابِرَ هَٰؤُلَاءِ مَقْطُوعٌ مُصْبِحِينَ) “আমি তাকে এ বিষয়ে ফয়সালা জানিয়ে দিলাম যে, ভোরে ওদেরকে সমূলে বিনাশ করা হবে।” (সূরা আল-হিজরঃ ৬৬)
কারও কারও মতে, এখানে قَضَيْنَا শব্দটির অর্থ أَوْحَيْنَا বা আমরা ওহী প্রেরণ করেছি। এর কারণ এখানে শব্দটির পরে إِلَىٰ এসেছে।
যদি জানানো বা খবর দেয়ার অর্থ হতো, তবে এর পরে إِلَىٰ ব্যবহৃত হতো না। আর যদি ফয়সালা করা বা বিচার করা অর্থ হতো, তবে শব্দটির পরে على আসতো। আর যদি পূর্ণ করার অর্থ হতো, তবে শব্দটির পরে ل আসত। সুতরাং এখানে قَضَيْنَا শব্দের অর্থ, أَوْحَيْنَا বা আমরা ওহী প্রেরণ করেছি হওয়াই বেশী যুক্তিযুক্ত।
(ফাতহুল কাদীর)
আল্লাহ তাআলা এ আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বনী ইসরাঈল দু’বার পৃথিবীতে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তারা চরম অহংকারে লিপ্ত হবে। এই ঘোষণা কোনো আকস্মিক শাস্তির কথা নয়; বরং আগাম সতর্কবার্তা; যাতে তারা নিজেদের সংশোধন করে।
এখানে বিপর্যয় বলতে বোঝানো হয়েছে আল্লাহর বিধান অমান্য করা, জুলুম–নির্যাতন চালানো ও নৈতিক অবক্ষয়। আর অহংকার তাদের সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রেখে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।
এই আয়াতের প্রধান শিক্ষা হলো; যে কোনো জাতি যদি ক্ষমতা ও মর্যাদা পেয়ে অহংকারে ডুবে যায় এবং আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, তবে পরিণামে তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী।
এই আয়াত আমাদেরকে প্রথমত শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া কিতাব, জ্ঞান ও মর্যাদা কখনোই দায়মুক্তির সনদ নয়। বরং এগুলো দায়িত্ব ও পরীক্ষার মাধ্যম। বনী ইসরাঈল আগাম সতর্কবার্তা পেয়েও যখন আল্লাহর বিধান অমান্য করল, তখন তাদের বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, আয়াতটি জানিয়ে দেয় যে জাতিগত পরিচয়, অতীত গৌরব বা ধর্মীয় পরিচয় অহংকারের কারণ হলে তা ধ্বংস ডেকে আনে। অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে এবং জুলুম ও সীমালঙ্ঘনকে স্বাভাবিক করে তোলে।
তৃতীয়ত, এখানে স্পষ্ট শিক্ষা হলো; বিপর্যয় হঠাৎ আসে না। আল্লাহ তাআলা পূর্বেই সতর্ক করেন, সুযোগ দেন সংশোধনের। কিন্তু যখন সেই সুযোগ অবহেলা করা হয়, তখন শাস্তি নেমে আসে।
সবশেষে, এই আয়াত মুসলিম উম্মাহসহ সব জাতির জন্য এক জীবন্ত সতর্কবার্তা; ন্যায়, বিনয় ও আল্লাহর আনুগত্য বজায় না থাকলে কোনো জাতির ক্ষমতা, সভ্যতা বা প্রভাব স্থায়ী হয় না।