সিরাজুল ইসলাম আমিরুল ইসলাম
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শুরু হয়েছে ক্ষণগণনা। সে হিসাবে নির্বাচনের বাকি আছে আর ৩৬ দিন। এ দিনগুলো দেশের মানুষের জন্য স্বস্তির নাকি উৎকণ্ঠার হবে, তা নির্ভর করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আন্তরিকতার ওপর। সরকারের হয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে কাজ করার কথা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। তবে পরবর্তী সরকার কে বা কোন দলের হবে, সে হিসাবনিকাশ শুরু হয়েছে পুলিশসহ বেসামরিক প্রশাসনে। আর এ কারণেই কাজের চেয়ে আগামী সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন অনেকে। পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রুটিন কিছু কাজ নিয়ে আছে। তবে রুটিন কাজ চললেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধিকাংশ কর্মকর্তা আড্ডায় পার করছেন সময়।
অন্যদিকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও আগামী সরকার নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারেক রহমানের কাছে বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, ব্যাংক খাতে সুদহার কমানো, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট দূর করা, প্রশাসনে দুর্নীতি বন্ধসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে সোমবার দেশের বাম দলগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য কয়েকটি দলের নেতাও তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন। এছাড়াও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালকরা। এমন বাস্তবতায় জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে বলা হয়েছে-প্রশাসন একটি দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, আইন ও বিধির আলোকে রুটিন কাজ করা সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব। সেবা প্রদান তাদের নৈতিক কর্তব্য। পরবর্তী সরকারে কারা আসবেন, তা দেখা কোনো সরকারি কর্মচারীর কাজ না। তিনি আরও বলেন, গোটা প্রশাসনযন্ত্র গতিপথ হারিয়েছে। সবাই দলীয় আনুকূল্য পেতে আগ্রহী। তেলবাজি ও তোয়াজ-তোষামোদি করে চেয়ার রক্ষা, পদোন্নতি ও ভালো পোস্টিং পাওয়াকে অধিকাংশ কর্মচারী মর্যাদার বিষয় মনে করেন। তিনি আরও বলেন, অতীতের সরকারগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রশাসনকে দলীয়করণ করেছে। এটা তার অনিবার্য ফল।
সরকারের প্রশাসনযন্ত্রের বড় অংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে জনমনে কৌতূহল রয়েছে-নির্বাচন সামনে রেখে কী করছে তারা? একজন অতিরিক্ত আইজিপি যুগান্তরকে বলেন, পুলিশের বেশির ভাগ কর্মকর্তা এখন বিএনপিমুখী। এসব কর্মকর্তা দুটি ধারায় বিভক্ত। বেশির ভাগ কর্মকর্তা চান উচ্চপর্যায়ে রদবদল। বিশেষ করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে সেখানে নিয়মিত কর্মকর্তাদের চান তারা। আরেকটি অংশ বর্তমান নেতৃত্বেই আগামী নির্বাচনে ভূমিকা পালন করার পক্ষে। তারা বলছেন, পুলিশে এ মুহূর্তে নেতৃত্বে পরিবর্তন হলে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। পুলিশের এই দ্বিমুখী মনোভাব নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে সরকার।
সূত্রমতে, আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার, এসবিপ্রধান ও র্যাবপ্রধান-উচ্চপর্যায়ের এসব পদে পরিবর্তনের জন্য দফায় দফায় ফাইল গেছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে। পুলিশবাহিনীতে পক্ষ-বিপক্ষ বিরোধে এ ফাইল সই হয়নি বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বৃহস্পতিবারের মধ্যে ওই ফাইল সই হতে পারে। আর তা না হলে আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পুলিশের নেতৃত্বের কোনো পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। পুলিশের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার কোনো দলের হয়ে কাজ করতে চাচ্ছে না। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় পদগুলোয় পরিবর্তনের আগে অনেক কিছু বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, পদোন্নতি এবং ভালো জায়গায় পদায়নের আশায় পুলিশের কিছু কর্মকর্তা নির্বাচন নিরপেক্ষ করতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করছে। কিন্তু আরেকটি অংশ মনে করছে, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলে তাদের ভাগ্যের আরও উন্নতি হবে। তাই যে দল ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি, তাদের বিপক্ষে যায়-এমন দৃশ্যমান কিছু করতে চাইছেন না তারা। আবার বর্তমানে যারা পুলিশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের অনেকে দায়িত্বে নাও থাকতে পারেন-এমনটা মনে করছেন কেউ কেউ। ফলে ওই পদগুলোয় কারা আসবেন, এ নিয়ে রয়েছে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। তাই এ অংশটি তাকিয়ে আছে পরবর্তী সরকারের দিকে। তারা যুক্ত হচ্ছেন নানা তৎপরতায়। পদোন্নতি, পদায়ন ও চাকরিতে টিকে থাকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তাদেরই কেউ কেউ। অতি উৎসাহীদের কেউ কেউ গোপনে যোগাযোগ রাখছেন ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা আছে-এমন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার পতনের পেছনে তাদের কার কী ভূমিকা ছিল, সেটি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন তারা। পরিস্থিতি অনুকূলে নিতে কোনো কোনো কর্মকর্তা প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করতেও ছাড়ছেন না। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
একজন পুলিশ সুপার (এসপি) যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ এখনো জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। পুলিশে এখানো ভয়ভীতি আছে। কোথাও কোনো ঝামেলা হলে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ যেতে চায় না। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকার না থাকায় পুলিশ কর্মকর্তারা এখন নিজেদের নিরাপদ মনে করছেন না। তারা ঝুঁকি নিয়ে কোনো কাজ করতে অনাগ্রহী। নিজ থেকে দায়িত্ব নিয়ে কিছু করতে চাইছেন না। পুলিশ হার্ডলাইনে গেলে অন্তর্বর্তী সরকার তাকে কতখানি সাপোর্ট দেবে, এ নিয়ে কারও কারও মনে সংশয় রয়েছে। তাই সময়টা কোনোমতে পার করে পরবর্তী সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন তারা।
পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, পুলিশ আগের চেয়ে অনেক অ্যাকটিভ হলেও তাদের মধ্যে কিছু দুর্বলতা আছে। সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে তারা মব-সন্ত্রাস ঠেকাতে পারছে না। তাদের মধ্যে সক্ষমতার অভাবের পাশাপাশি আছে নানা চ্যালেঞ্জও। সবাই আন্তরিক হলে চ্যালেঞ্জগুলো সহজেই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
পুলিশের এআইজি এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন বলেন, পুলিশের মধ্যে কোনো ধরনের ভয়ভীতি কাজ করছে না। পুরো উদ্যম নিয়ে মাঠে আছেন পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের মনোবল এখন আগের চেয়ে অনেক চাঙা। নির্বাচন সামনে রেখে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর অবস্থা এড়াতে পুলিশ প্রস্তুত আছে।
স্থবিরতা বিরাজ করছে প্রশাসনে : জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজকর্ম কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে-এমন আলোচনা আছে সচিবালয়সহ প্রশাসনের সর্বস্তরে। মন্ত্রণালয়ের সভা কিংবা বৈঠকগুলোয়ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসছে। বিশেষ করে পরবর্তী সময়ে কারা দেশ পরিচালনা করবেন, সেই আলোচনা প্রশাসনের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরেও ছড়াচ্ছে। এ কারণে অনেকেই পরবর্তী সরকারের কাছাকাছি যাওয়ার রাস্তা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। প্রশাসনের মধ্যে কারা প্রভাবশালী বা কোন দলের সমর্থক, সেটি বিবেচনায় নিয়ে তাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের অজুহাতে জনসেবা প্রদান কিংবা রুটিন কাজে শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই। রুটিন কাজ না করে ফেলে রাখাও একধরনের অপরাধ। তারা আরও বলছেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা সরকারের স্থায়ী অংশ। কে ক্ষমতায় আছে বা কে ক্ষমতায় আসবেন, তা দেখা কর্মচারীর কাজ না। তাদের উচিত অর্পিত দায়িত্ব আইন ও বিধিবিধানের আলোকে পালন করা। নির্বাচনি আইনে কোথাও বলা নেই তফসিল ঘোষণা করলে সেবা বা স্বাভাবিক কাজ বন্ধ রাখতে হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, বর্তমান সরকারের কাছ থেকে দেশের মানুষ পরিবর্তন আশা করেছিল। কিন্তু তারা দলীয় সরকারের চেয়ে অনেক পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। মেরামতের পরিবর্তে প্রশাসনে আরও বিশৃঙ্খলা ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, আগের চেয়ে কাজ অনেক কমে গেছে। বলা যায়, কাজই নেই। তিনি বলেন, অফিসে আসি, বন্ধুরা আসেন, গল্পগুজব-আড্ডা হয়, এরপর বাসায় চলে যাই। মাঝেমধ্যে মিটিং থাকলে অংশ নিই। সবাই নতুন সরকারের আগমনের অপেক্ষা করছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাজ নেই। শুধু আসা-যাওয়ার পালা। এলেও সিনিয়র-জুনিয়র মিলে আড্ডা হয়। পাশাপাশি কারা ক্ষমতায় আসছেন, সে বিষয়েও চলে নানারকম গবেষণা। একই মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব বলেন, নতুন সরকার না আসা পর্যন্ত কাজে আর গতি আসবে না।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ভরা মৌসুমে বাজারে টমাটো, শসা ও খিরা ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কাজ কী-এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এখানে কি সরকারের কোনো দায় নেই? শুধু অফিসে এসে গল্পগুজব করে বুক ফুলিয়ে বলা হচ্ছে-তফসিলের পর এখন কাজকর্ম একটু কম। কোনো জবাবদিহি নেই। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত কাঁচাবাজার তদারকি করলে মধ্যস্বত্বভোগীরা হতদরিদ্র মানুষের পকেট কাটতে পারত না।
এদিকে মধ্যম সারির কর্মকর্তাদের কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবি ভাইরাল হচ্ছে। বিগত ১৫ মাসে অনেক কর্মকর্তা ছাত্রজীবনের যেসব বন্ধু, বড় ও ছোট ভাই রাজনীতি করতেন এবং এখনো করছেন, তাদের সঙ্গে বিশেষ সখ্য গড়ে তুলেছেন। ইউনিয়ন থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে এখন তারা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন। উদ্দেশ্য একটাই-ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য এবং ভবিষ্যতে সরকারের ভালো জায়গায় পদায়ন।
আমার দেশ।