মিজানুর রহমান বাবুল সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
ভেনিজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপে বিশ্ববিবেকের সামনে প্রশ্ন
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যখন আধিপত্যবাদের বুলেটের নিচে পিষ্ট হয়, তখন তা কেবল একটি দেশের সংকট নয়—তা হয়ে ওঠে সমগ্র মানবতার জন্য অশনিসংকেত। সাম্প্রতিক সময়ে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং দেশটির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটকের ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা শুধু ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপই নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতির প্রতি এক প্রকাশ্য অবজ্ঞা।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রেসিডেন্ট মাদুরো কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি ভেনিজুয়েলার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তার ও তার স্ত্রীর আটক ভেনিজুয়েলার জনগণের আত্মসম্মান, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত বলে মনে করছেন অনেকেই।
রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে স্পষ্ট হয়—যে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের প্রথম এবং প্রধান ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ। আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞার চাপে নাকাল ভেনিজুয়েলার সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে শিশুরা, খাদ্য ও ওষুধ সংকটে ভুগছে। এমন বাস্তবতায় নতুন করে সামরিক আগ্রাসন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে বলেই আশঙ্কা করছেন মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বলপ্রয়োগ করে কখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ইরাক, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার উদাহরণই তার যথেষ্ট প্রমাণ। ভেনিজুয়েলায় যদি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকট থেকেও থাকে, তার সমাধান হওয়া উচিত ছিল সংলাপ, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য আলোচনার মাধ্যমে। কিন্তু বন্দুকের নলের মুখে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করা সভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে।
এই ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। যখন কোনো পরাশক্তি একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেও জবাবদিহির মুখোমুখি হয় না, তখন তা ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’কে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এর ফলশ্রুতিতে ভবিষ্যতে আরও বড় অন্যায় সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
ভেনিজুয়েলার এই সংকটময় সময়ে বিশ্ববাসীর নীরবতা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। আজ একটি দেশের সার্বভৌমত্ব পদদলিত হলে, আগামী দিনে অন্য দেশগুলোর জন্যও একই পরিণতি অপেক্ষা করতে পারে। তাই রাজনৈতিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক আইনের স্বার্থে এই ধরনের আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর সোচ্চার হওয়া জরুরি।
ভেনিজুয়েলা ফিরে পাক তার সার্বভৌম অধিকার। মনে রাখতে হবে, শক্তি দিয়ে কেবল ভূমি দখল করা যায়—মানুষের সম্মান, আত্মমর্যাদা কিংবা স্বাধীনতা নয়।