গাইবান্ধা প্রতিনিধি
কম্বল পেয়ে হাসি ফুটেছে তাঁদের মুখে। গতকাল গাইবান্ধায়।
প্রচণ্ড শীতের মধ্যে কম্বল পেয়ে আনেন্দর সীমা নেই জাহেদুল ও নাকিব নামের দুই শিশুর। মাদরাসার এই দুই শিক্ষার্থী বারবার কম্বল উঁচিয়ে দেখাচ্ছিল। নাকিব বলল, ‘আজ রাতে কম্বলে একা ঘুমাব!’
গতকাল বুধবার গাইবান্ধায় বিপিএল মাতানো রংপুর রাইডার্স ও সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের (এসবিজি) কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠানে কম্বল পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে ওই দুই শিশু।
গাইবান্ধায় তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত জনজীবন।
সূূর্যের দেখা নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের দুস্থ অসহায় মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে দুঃসহ সময় পার করছে। এ সময় রংপুর রাইডার্স ও সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল (এসবিজি) তাদের হাতে তুলে দিল কম্বল।
সংগঠকরা জানান, গতকাল প্রথম দিন দুই হাজার নারী ও পুরুষ পেলেন এই উষ্ণ সহায়তা।
আরো দুই হাজার পাবেন পরবর্তী নির্ধারিত দিনে।
কম্বল পেয়ে খুব খুশি বাচ্চানী বেওয়া (৭৭) ও সবুরননেছা (৭০)। বাচ্চানী বেওয়া বললেন, ‘ক্যা বাহে, এই যে ১৫-১৬ দিন ধরিয়্যা জারোতে (শীত) কষ্ট পাছি, আতোত ঘুমাব্যার পাই নাই। গ্রামের বড় মিয়া, ছোট মিয়া সগলেকই কছি, একটা গরম কাপাড়া দেও।
কাঁইয়ো পাত্তা দিল না! এমরা না ক্রিরকেট খেলায়। তারায় দুঃক বুঝিল! আল্লাহ সোগ বুঝে। ’
বলতে বলতে চোখে পানি এসে গেল। খুশি মনে বাড়ির পথ ধরলেন তাঁরা।
গাইবান্ধা সদরের বোয়ালী ইউনিয়নের থানসিংহপুর এলাকার সাহেবউল্লাহ সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বিকেল ৩টা থেকেই ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়।
তারা আসছিল আর সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিলেন স্বেচ্ছাসেবকরা। অভাবী মানুষের অনেকেই হিমেল হাওয়ায় কাঁপছিল।
এক পর্যায়ে কম্বল বিতরণ উদ্বোধন করেন রংপুর রাইডার্সের হেড অব অপারেশনস ও টি স্পোর্টসের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর তাসভীর উল ইসলাম। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বোয়ালী ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুর ইসলাম সাবু, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. আমজাদ হোসেন, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব মহফিল হোসেন, কলেজ শিক্ষক আজিজুল ইসলাম, এইচ এম শাহনেওয়াজ সমিতসহ অন্যরা।
কথা বলে জানা গেল, শীতার্ত এসব মানুষ এসেছিল থানসিংহপুর কাচারি, খামার বোয়ালিয়া, খেয়াঘাট ও পাশের গুচ্ছগ্রাম থেকে। শিশু, নারীসহ সব বয়সের মানুষ ছিল। খেয়াঘাটের আমিনুল ইসলাম (৭৫) বললেন, ‘এবারের শীতের মতো এত কষ্ট আর পাইনি। পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া পাতলা কম্বল দিয়ে রাতে ঘুমানো খুবই কঠিন। শুনেছি, সরকারি কম্বল দেওয়া হচ্ছে। আমরা কোনো দিন তার নাগাল পাই না। রংপুর রাইডার্সকে ধন্যবাদ যে তারা পাশে দাঁড়াল।’ তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের মানুষদের গরিবের জন্য ভালোবাসা আছে। আল্লাহ তাঁদের হায়াত দারাজ করুন!’
কম্বল পেয়ে থানসিংহপুর গ্রামের আনোয়ারা বেগম (৭৫) জানান, অন্যের বাড়িতে কাজ করে তাঁর জীবন চলে। এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। তাই মাঝেমধ্যে ভিক্ষা করতে হয়। কম্বলটি পেয়ে খুব উপকার হলো।
কম্বল হাতে জাহেদুল ইসলাম (৬৫) বলেন, ‘দুই ছেলে শ্রমিকের কাজ করে। তারা নিজেদের সংসারই ঠিকমতো চালাতে পারে না, আর আমাকে চালাবে কী? অভাবের সংসারে শীতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। আজ থেকে কষ্ট কমল।’
এই আয়োজনের অন্যতম সংগঠক ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব মহফিল হোসেন বললেন, ‘এ অঞ্চলে দুস্থ মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। রংপুর রাইডার্স ও এসবিজি (সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল) এই কষ্টকর সময়ে তাই এলাকাটি বেছে নিয়েছে। আমরা কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে প্রকৃত অভাবী মানুষের তালিকা করেছি। তার ভিত্তিতেই কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে।’
হেড অব অপারেশনস রংপুর রাইডার্স ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর টি স্পোর্টস তাসভীর উল ইসলাম বলেন, ‘বিপিএলে রংপুর রাইডার্স অংশ নিচ্ছে। এই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করছে তারা। তাই এখানকার মানুষের জন্য দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা থেকেই এই উষ্ণতা উপহার। বেছে নেওয়া হয়েছে এমন একটি এলাকা, যেখানকার প্রান্তিক খেটে খাওয়া মানুষ গরম কাপড় সংগ্রহ করতে পারেন না। মানবিক এমন কাজে আমরা আগেও ছিলাম, আছি এবং আগামী দিনেও থাকব।’ তিনি রংপুর রাইডার্সের সাফল্যের জন্য সবার দোয়া কামনা করেন।
সন্ধ্যা নামার একটু আগে শেষ হয় আয়োজন। কম্বল নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফেরেন শিশু, নারী ও পুরুষ।