♦ দেশে ৩২০০ কিলোমিটার রেলপথ ♦ দিনে গড়ে তিনজনের মৃত্যু
আলী আজম
লেভেল ক্রসিংবার ফেলার পরও ঝুঁকি নিয়ে চলছে মানুষ ও যানবাহন। ছবিটি রাজধানীর জুরাইন থেকে তোলা ছবি : জয়ীতা রায়
রেললাইনে প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে, মিলছে লাশ। এর মধ্যে বেশির ভাগই আত্মহত্যা। এ ছাড়া রয়েছে অসচেতনতা বা অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু। অপরাধীরাও হত্যাকাণ্ড আড়াল করতে রেললাইনে লাশ ফেলে যায়।
এ লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেলে না রিপোর্ট। পাওয়া যায় না পরিচয়। এর প্রধান কারণ ট্রেনে কাটা পড়া লাশ বিকৃত হয়ে যায়।
ফলে জানা যায় না মৃত্যুর আসল কারণ। এসব লাশ ময়নাতদন্তে পাঠানো হলেও রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে রিপোর্ট পাওয়া গেলে দেখা যায় লাশে রয়েছে অন্য রহস্য। মৃত্যুর ধরন দেখে দুর্ঘটনা মনে হলেও দেখা যায় এ লাশ ছিনতাইকারীরা ফেলেছে অথবা হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে লাশ এনে রেললাইনে ফেলে দুর্ঘটনা হিসেবে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
অহরহ ট্রেন দুর্ঘটনায় রেলপথ পরিণত হয়েছে মারণফাঁদে।
গত ১৭ ডিসেম্বর দুপুরে ফরিদপুর শহরের ১ নম্বর হাবেলীর গোপালপুর ৩ নম্বর রেলগেট এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে দীপ্তি রানী সাহা (৩৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি ফরিদপুরের চণ্ডিপুর এলাকার বাসিন্দা। জানা গেছে, তিনি রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী মধুমতী এক্সপ্রেস ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ১৮ ডিসেম্বর রাতে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ঘোড়াশাল রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় ট্রেনের ছাদ থেকে ছিটকে রেললাইনে কাটা পড়ে মো. আলম মিয়া (৪৬) নামে এক রিকশাচালকের মৃত্যু হয়।
তিনি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের সালুয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাদে ঢাকায় ফিরছিলেন। ১৯ ডিসেম্বর সকালে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ার বালুরমাঠ এলাকায় রাস্তা পারাপারের সময় ট্রেনে কাটা পড়ে মো. তাজউদ্দীন নামে এক ফল বিক্রেতার মৃত্যু হয়। তিনি বন্দর উপজেলার বেজেরগাঁও এলাকার বাসিন্দা।
শুধু এই তিনজনই নন, সারা দেশে অসতর্কতায় বাড়ছে ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা। অসচেতনভাবে চলাফেরা, কানে হেডফোন দিয়ে রেললাইনের ওপর দিয়ে চলা, মুঠোফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হওয়া, রেললাইনের ওপর বসে থাকা, তাড়াহুড়া করে লেভেল ক্রসিং পার হওয়া, চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সেলফি তোলাসহ বেশ কিছু ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায়ই ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। এ ছাড়া চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা তো আছেই। ট্রেন আসার আগ মুহূর্তে যেসব জায়গায় লাইনম্যান দুই দিকে ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা পারাপার বন্ধ করে দেন, সেখানেও ব্যারিকেডের নিচ দিয়ে কিংবা দুই পাশের যেকোনো এক পাশ দিয়ে ঢুকে পড়েন পথচারী এবং সাইকেল-মোটরসাইকেল চালকরা। ট্রেন কাছাকাছি চলে এলেও নির্বিকার পার হয়ে যান তারা। অনেক সময় এ কারণেও ট্রেনে কাটা পড়ছে মানুষ।
রেলওয়ে পুলিশের তথ্যানুযায়ী, গত ১০ বছরে অসতর্কতা ও অসচেতনভাবে রেললাইন ব্যবহারের কারণে ৯ হাজার ২৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত তিন বছরে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪০ জনে, অর্থাৎ এ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ট্রেনে কাটা পড়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। রেললাইনে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় কাউকে দায়ী করা হয় না। রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া রেললাইন ব্যবহার অবৈধ। রেললাইনের দুই পাশে ২০ ফিটের মধ্যে নির্দিষ্ট লোক ছাড়া কেউ অবস্থান করতে পারবে না। এ এলাকায় সরকারিভাবে সাধারণ চলাচলের জন্য নয় বলে সব সময় ১৪৪ ধারা জারি থাকে।
ওই সীমানার ভিতর কাউকে পাওয়া গেলে গ্রেপ্তারের বিধানও রয়েছে। এমনকি এর মধ্যে গরু-ছাগল ঢুকে পড়লে সেটিকেও নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে রেল কর্তৃপক্ষের। ট্রেনে কাটা পড়ে কেউ আহত হলে উল্টো ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই মামলা করতে পারে রেলওয়ে। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও রেলওয়ে পুলিশের ইতিহাসে এমন কোনো নজির নেই। আইন ভঙ্গ করে রেললাইনে প্রবেশে দুর্ঘটনা ঘটলে তা ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর দায়ভার কারও ওপর বর্তায় না।
রেলওয়ে পুলিশের এসপি (অপরাধ ও তদন্ত) মো. সাইফুল হক জানান, পরিসংখ্যানে দেখা যায় দৈনিক গড়ে তিনজন ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়। কখনো কখনো হত্যাকাণ্ডকে ভিন্ন খাতে নিতে দুষ্কৃতকারীরা লাশ এনে লাইনের ওপর ফেলছে। তিনি আরও বলেন, সারা দেশে ৩২০০ কিলোমিটারে ওপরে রেলপথ রয়েছে। পুরো রেলপথ পাহারা দেওয়া রেলওয়ে পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। যত্রতত্র রেললাইন দিয়ে চলাফেরা, রেললাইনের অংশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, কাঁচাবাজার বসানো এবং অবৈধ রাস্তা তৈরি করে রেললাইন ঘেঁষে চলাচলা করছে লোকজন। এ কারণেই ট্রেন দুর্ঘটনা বাড়ছে।