সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম
লাইটার জাহাজ সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা
লাইটার জাহাজ সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অলস ভাসছে মাদার ভেসেল। ছবি: মিনহাজ ঝন্টু
লাইটার জাহাজের তীব্র সংকটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ভয়াবহ জাহাজ জট তৈরি হয়েছে। তিন লাখ টনেরও বেশি পণ্য নিয়ে ৮৫টির বেশি মাদার ভেসেল গভীর সাগরে অলস অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে প্রতিদিন প্রতিটি জাহাজের বিপরীতে ১২ থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ওয়েটিং চার্জ দিতে হচ্ছে আমদানিকারকদের, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তাপর্যায়ে। রমজান সামনে রেখে এ সংকট আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে পর্যাপ্ত ড্রাফট না থাকায় বড় জাহাজ সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। ফলে বহির্নোঙরে অবস্থানরত মাদার ভেসেল থেকে ছোট আকারের লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস করে দেশের বিভিন্ন নৌঘাটে পাঠানো হয়। কাগজ-কলমে অভ্যন্তরীণ রুটে প্রায় দেড় হাজার লাইটার জাহাজ থাকলেও বাস্তবে সক্রিয় রয়েছে এক হাজারেরও কম। বাকি জাহাজ স্ক্র্যাপ, ডকে অবস্থান বা অন্যান্য রুটে চলাচলের কারণে অপারেশনের বাইরে।
স্বাভাবিক সময়ে বহির্নোঙরে ৩২ থেকে ৩৫টি মাদার ভেসেল পণ্য নিয়ে অপেক্ষা করে। হাজারখানেক লাইটার সার্বক্ষণিক অপারেশনে থাকলে ৩৫ থেকে ৩৮টি মাদার ভেসেল হ্যান্ডলিং করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে বহির্নোঙরে পণ্যবাহী মাদার ভেসেলের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৮৫টির বেশি। কারণ, গত এক মাসের বেশি সময় ধরে চাহিদা অনুযায়ী লাইটার জাহাজ সরবরাহ করতে পারছে না লাইটারেজ জাহাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি)। ফলে ধীরে ধীরে সংকট প্রকট হয়েছে। দিন দিন বহির্নোঙরে জট কেবল বাড়ছেই।
বিডব্লিউটিসিসির নির্বাহী পরিচালক মেজর (অব.) জিএম খান জানান, হঠাৎ চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেল আসার পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এত পণ্য দ্রুত খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে জট তৈরি হয়েছে। এর বাইরে বিএডিসি বিপুল পরিমাণ সার এনেছে। কিন্তু তাদের কোনো গুদাম নেই। চট্টগ্রাম থেকে সার নিয়ে যেসব লাইটার দেশের বিভিন্ন এলাকায় গেছে, সেগুলো দেড় থেকে দুই মাসেও ফিরে আসেনি। বর্তমানে শুধু বিএডিসির ১৫৩টি লাইটার জাহাজ ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এর বাইরে বড় বড় শিল্প গ্রুপ হঠাৎ বিপুল গম আমদানি করেছে। তারাও প্রায় দেড়শ লাইটার জাহাজ বিভিন্ন ঘাটে ভাড়া নিয়ে আটকে রেখেছে। এভাবে কম-বেশি ৩০০ জাহাজ অপারেশনের বাইরে চলে গেছে। এর বাইরে বিভিন্ন কোম্পানি লাইটার ভাড়া নিয়ে আটকে রেখেছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ জাহাজ বিভিন্ন এলাকায় আটকে আছে। এর ওপর স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি মাদার ভেসেল এসেছে। সবগুলো বিষয় একসঙ্গে হয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ জানান, প্রতি বছর রমজানের আগে এমন সময় লাইটার জাহাজের সংকট হয়। মূলত অব্যবস্থাপনার কারণে গত ২০-২৫ বছর ধরে এ সংকট লেগেই আছে। তবে এবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বন্দর ও নৌ পরিবহন অধিদপ্তর এবং লাইটার জাহাজ মালিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ অবস্থা থেকে উত্তরণ কঠিন। কারণ শুধু যে লাইটার জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে করা হচ্ছে তা নয়, বিভিন্ন ঘাটে ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা জেটিগুলো এখন বর্ধিত চাপ নিতে সক্ষম নয়। সংকটের সময় নৌ পুলিশ ও কোস্ট গার্ড অভিযানের নামে জরিমানা করে। এটিও লাইটার মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
জাহাজ ব্যবসায়ী লিটমন শিপিংয়ের মালিক বেলায়েত হোসেন জানান, একটি মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের জন্য দৈনিক তিন-চারটি করে লাইটার জাহাজ প্রয়োজন। সে হিসেবে বহির্নোঙরে ৮৫টি জাহাজের বিপরীতে দৈনিক ২৬৫ থেকে ৩২০টি লাইটার জাহাজের প্রয়োজন। তবে ৪৫ থেকে ৬০টির বেশি লাইটারের সরবরাহ দিতে পারছে না বিডব্লিউটিসিসি। ফলে পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংকটের সমাধান করা না গেলে আসছে রমজানে নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক জানান, রমজানের আগে প্রতি বছর বাল্ক কার্গো আমদানি বাড়ে। এবারও বেড়েছে। একটি ৫০ হাজার টনের মাদার ভেসেল আগে যেখানে চার-পাঁচদিনের মধ্যে পণ্য খালাস করত, এখন সেখানে ৮-৯ দিন লাগছে। জাহাজের সংকটের কারণে নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক লাইটার ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে-এমন অভিযোগও আছে। চট্টগ্রাম এলাকায় বন্দরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। কোনো জাহাজ ৭২ ঘণ্টার বেশি পণ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একটি জাহাজ যখন পণ্য নিয়ে দেশের অন্য গন্তব্যে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে, সেখানে বন্দরের কিছু করণীয় নেই। তবে ঘাট এলাকাগুলোয় সেখানকার স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।