ধর্ম ডেস্ক
বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ: ইসলামের সমাজদর্শন
একটি আদর্শ সমাজ ও পরিবারের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং সম্মান। ইসলামি সমাজব্যবস্থায় বড়দের জন্য রয়েছে বিশেষ মর্যাদা আর ছোটদের জন্য রয়েছে অগাধ মমতা। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (স.) তাঁর জীবনাচরণ ও বাণীর মাধ্যমে এই দুই শ্রেণির মানুষের প্রতি আচরণের যে নীতিমালা দিয়ে গেছেন, তা অনুসরণ করলে একটি অস্থির সমাজও শান্তিময় হয়ে উঠতে পারে। নিচে এ বিষয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হলো।
বড়দের সম্মান: আল্লাহকে মহিমান্বিত করার অংশ
ইসলাম শেখায় যে, বয়োজ্যেষ্ঠ বা সাদা চুলের অধিকারী ব্যক্তিরা আল্লাহর কাছে বিশেষ সম্মানের পাত্র। বড়দের সম্মান করা আসলে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণারই নামান্তর।
আল্লাহর প্রতি সম্মান: রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই বয়োজ্যেষ্ঠ মুসলমানকে সম্মান করা মহান আল্লাহর মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৪৩)
ভবিষ্যতের প্রতিদান: নবীজি (স.) বলেছেন, ‘কোনো যুবক যদি কোনো বৃদ্ধকে তার বার্ধক্যের কারণে সম্মান করে, তবে আল্লাহ তাআলা তার বার্ধক্যের সময় তাকে সম্মান করবে এমন লোক নিয়োজিত রাখবেন।’ (সুনানে তিরমিজি: ২০২২)
উম্মতভুক্ত হওয়ার শর্ত: রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান ও মর্যাদা চেনে না।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৯১৯; আবু দাউদ: ৪৯৪৮
উচ্চমানের আদব
প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম কাজী আবু ইয়া‘লা (রহ.) বড়দের সঙ্গে পথচলার একটি সূক্ষ্ম শিষ্টাচার শিখিয়েছেন। তিনি বলেন, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে ‘ইমামের স্থানে’ রাখতে হবে, অর্থাৎ নিজে ডানে থেকে বাম দিকটা তাঁর জন্য ছেড়ে দিতে হবে। এটি ফিকহি হুকুম নয়, বরং ইসলামের উচ্চমানের ‘আদব’ হিসেবেই গণ্য।
ছোটদের স্নেহ: নবীজির অনুপম আদর্শ
ছোটরা নিষ্পাপ এবং কোমল হৃদয়ের অধিকারী। নবীজি (স.) শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি শিশুদের জান্নাতের ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বলতেন- ‘শিশুরা জান্নাতের ফুল’। (তাবারানি কাবির: ৪৬১; মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ১৩৯৭৫) প্রিয় নাতি হাসান-হোসেন (রা.)-এর ব্যাপারেও বলেছেন- তারা আল্লাহর সুগন্ধিময় দুটি ফুল। (সহিহ বুখারি: ৫৯৯৪)
মমতা ও দয়া: একদিন এক বেদুঈন নবী (স.)-এর সমীপে উপস্থিত হয়ে বলল- তোমরা কি শিশুদের চুম্বন করো? আমরা তো শিশুদের চুম্বন করি না। এটা শুনে নবী (স.) বললেন- যদি আল্লাহ তাআলা তোমার অন্তর থেকে স্নেহ-মমতা বের করে নেন, তবে আমি কি পারব তা তোমার অন্তরে পুনঃপ্রবেশ করাতে? (মেশকাত: ৪৯৪৮)
স্নেহের প্রভাব: একবার এক ব্যক্তি নবীজিকে শিশুদের চুমু খেতে দেখে অবাক হলে তিনি বললেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৯৭)
সব শিশুর প্রতি মমতা: নবীজি (স.) জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব শিশুর প্রতি সমান ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন। তিনি বলতেন, ‘প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের (ইসলামের স্বভাবের) ওপর জন্মগ্রহণ করে।’ (সহিহ বুখারি: ১৩৫৮)
এতিম ও শিশুদের অধিকার রক্ষা
নবীজি (স.) এতিম শিশুদের প্রতি বিশেষ মমতা দেখাতেন। তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল জোড়া লাগিয়ে জান্নাতে এতিম প্রতিপালনকারীর নিজের নৈকট্যের সুসংবাদ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি: ৫৩০৪)। এ ছাড়া শিশুদের সঠিক নামে ডাকা, তাদের শিক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
আনুগত্যের ভারসাম্য
বড়দের সম্মান করার অর্থ এই নয় যে তাদের সকল অন্যায় নির্দেশও মেনে নিতে হবে। ইসলাম এখানে একটি যৌক্তিক সীমারেখা দিয়েছে। নবীজি (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর অবাধ্যতা হয় এমন কাজে আনুগত্য নেই। আনুগত্য কেবলই ভালো কাজে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৮৪০)
বড়দের শ্রদ্ধা ও ছোটদের স্নেহ কেবল ব্যক্তিগত শিষ্টাচার নয়, বরং এটি একটি ঈমানি দায়িত্ব। সমাজ থেকে অবক্ষয় দূর করতে এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব অটুট রাখতে নবীজি (স.)-এর এই কালজয়ী শিক্ষা প্রতিটি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চর্চা করা আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।