মো আবদুল করিম সোহাগ
ঢাকা
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আসা যাত্রা দলগুলোর অংশগ্রহণে ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ থেকে শুরু হয়েছিল বিজয়ের মাসজুড়ে যাত্রাপালা প্রদর্শনী। রাষ্ট্রীয় শোকপালন উপলক্ষে বিঘ্নিত হওয়া উৎসবের সমাপনীর আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্দা নামলো মাসব্যাপী যাত্রাপালা নিবন্ধন উৎসবের।
আজ ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার আয়োজন করা হয় মাসব্যাপী যাত্রাপালার সমাপনী অনুষ্ঠানের। সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মফিদুর রহমান এবং সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক বরেণ্য কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক দীপক কুমার গোস্বামী।
ত্রয়োদশ যাত্রা নিবন্ধন উৎসব ২০২৫ সমাপনী অনুষ্ঠানে যাত্রাশিল্পে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বর্ষীয়ান যাত্রাশিল্পী আনোয়ার হোসনকে আজীবন সম্মননা স্মারক প্রদান করা হয়। এরপর তিনি তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, “যখন এই যাত্রাপালা নিবন্ধন উৎসব শুরু হয় তখন ৩০টি যাত্রাপালা মঞ্চায়নের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত ২৪ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ‘৩৬’ সংখ্যায় গিয়ে দাঁড়ায়, যা আমাদের কোনো পরিকল্পনায় ছিল না। ডিসেম্বরে যখন এই উৎসব শুরু হয় তখন আমি নাট্যকলার ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক দীপক কুমার গোস্বামীকে ‘জেনারেল ওসমানী’কে নিয়ে এক যাত্রাপালা মঞ্চায়নের কথা বলি। এর কারণ হচ্ছে ‘জেনারেল ওসমানী’ আমাদের ইতিহাসের এমন একজন হিরো যাকে নানাভাবে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এই পালা তৈরি করার জন্য একেবারেই অল্প সময় হাতে ছিলো। আমাদের এই সরকারও স্বল্প সময়ে অনেক বড় বড় এবং অসম্ভব কাজ সম্ভব করেছে। ঠিক তেমনি ৭ দিনের মধ্যেই জেনারেল ওসমানী’ যাত্রাপাল নির্মাণ করা হয়েছে। এই যাত্রাপালাটি আগামী মার্চ মাসে দেশের ৬৪টি জেলায় মঞ্চায়ন করা হবে। আমাদের যাত্রাপালাগুলোতে আমাদের দেশের গল্প খুব একটা থাকে না। ‘জেনারেল ওসমানী’ যাত্রাপালার মধ্য দিয়ে এই উদ্যোগটাও শুরু করা হলো। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আমাদের যাত্রাদলগুলো যেন আমাদের দেশের গল্প নিয়ে বেশি বেশি কাজ করে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে আশা করি।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মফিদুর রহমান বলেন, “এক মাস যাবত যাত্রাশিল্পীরা যাত্রা প্রদর্শন করছেন। সেখান থেকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ যাত্রাদল নিবন্ধন করেছেন। এটি এমন একটি অনুষ্ঠান যেখানে দর্শকরা একই সাথে যাত্রাও উপভোগ করতে পারছেন আবার যাত্রাদলগুলোর নিবন্ধনের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হচ্ছে।”
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বলেন, “আমরা এই উৎসবে ৩৬টি যাত্রাদলকে নিবন্ধিত করতে পেরেছি। এই ৩৬টি দলের বাইরেও বাংলাদেশে আরো অসংখ্য ভালো যাত্রাদল আছে যেগুলোকে আমরা পরবর্তীকালে চিহ্নিত করতে পারবো। আগামী মার্চ মাস থেকে ৬৪ টি জেলায় ‘জেনারেল ওসমানী’ যাত্রাপালাটি মঞ্চস্থ করবো এবং আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের যে মূল ইতিহাস এর কেন্দ্রবিন্দু জেনারেল ওসমানী- যিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন। তিনি কি পরিশ্রম করেছিলেন, কি অটল বিশ্বাসে মুক্তিযুদ্ধকে পরিচালনা করেছিলেন তা এ পালাতে ফুটে উঠেছে।”
এর আগে বেলা ৩টায় যাত্রাশিল্পীদের অংশগ্রহণে নগর পরিভ্রমণ-এর আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন দলের যাত্রা শিল্পীরা তাদের অভিনীত নানা চরিত্রের পোশাক পরিধান করে সংলাপ উচ্চারণ করেন এবং বিশাল যন্ত্রীদল বাদ্য-গীত সহকারে সজ্জিত ঘোড়ার গাড়ীসহ এই নগর পরিভ্রমণকে আনন্দময় করে তুলেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে শুরু করে দোয়েল চত্বর-শাহবাগ হয়ে আবারো শিল্পকলায় এসে শেষ হয় এই নগর পরিভ্রমণ।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি রেপার্টরি যাত্রা ইউনিট প্রদর্শন করে ঐতিহাসিক যাত্রাপালা ‘জেনারেল ওসমানী’। যাত্রাপালাটির পালাকার ছিলেন এম এ মজিদ এবং পরিচালনা করেছেন তানভীর নাহিদ খান।
এতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোঃ তাহাজ উদ্দিন, সুমি আক্তার, মোঃ শামীম খন্দকার, আব্দুল আজিজ, মানষ কুমার ঢালী, হরেন্দ্র নাথ মন্ডল, তুষার কান্তি মল্লিক, সৌমেন রায়, মোঃ রইচ উদ্দীন শাহ, মোঃ আসকার আলি (ওয়াসীম), মোঃ আফসারুজ্জামান (রনি), মোঃ খোরশেদ আলম মন্ডল, মোঃ মজীবর রহমান সেলিম, মোজাম্মেল হক, রিমা আক্তার, লাবলু উকিল, প্রণব রঞ্জন বালা, মোঃ হোসাইন জীবন, মোছা: লাভলী বেগম, তাসনোভা চৌধুরী, রিমি রফিক, শতরূপা ধর শ্যামা, মনিমা আক্তার মনি, ইসরাত জাহান তাসফির, দুলালী রায়, মোঃ আব্দুল মান্নান প্রমুখ। নেপথ্য শিল্পী ও কলা-কুশলী হিসেবে ছিলেন মোঃ শামীম খন্দকার, মোঃ হোসাইন জীবন, মুনিরা মাহজাবিন, মোঃ শাহাবুদ্দিন মিয়া, অমিত চৌধুরী, প্রণব রঞ্জন বালা, কৃষ্ণ চন্দ্র বর্মন, মোঃ তানভীর আহম্মেদ, রুদ্র রায়, মোঃ ফরুক মিয়া, শ্যামল চন্দ্র দাস, আলম, এম. এ. রহিম, কমল চন্দ্র দাস, নন্দিনী আহসান প্রমুখ।
মাসব্যাপী এই যাত্রাপালা প্রদর্শনীতে নিবন্ধিত ৩৫টি যাত্রাদল ৩৫টি যাত্রাপালা এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি রেপার্টরি যাত্রাদলের ১টিসহ ৩৬টি যাত্রাপালা মঞ্চায়িত হয়। প্রদর্শনীর টিকেট বিক্রি হতে প্রাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট যাত্রাদলকে প্রদান করা হয়। এছাড়াও প্রতিদিনের প্রদর্শিত যাত্রাপালাগুলো জুরি বোর্ডের বিচারকদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়।