ধর্ম ডেস্ক
পরিশুদ্ধ অন্তর, সত্যিকারের জয়
মানুষের অস্তিত্ব কেবল রক্ত-মাংসের দেহের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেহ ও আত্মার এক সমন্বিত রূপ। ইসলাম মানুষের বাহ্যিক ইবাদতের পাশাপাশি আত্মিক পরিশুদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘তাজকিয়াতুন নাফস’ বা নফসের পরিশুদ্ধি। নফসের পরিশুদ্ধি ছাড়া মানুষের ঈমান ও ইসলাম কখনো পূর্ণতা পায় না।
১. নফসের পরিশুদ্ধি কেন প্রয়োজন
একজন মানুষ বাহ্যিকভাবে নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত পালন করছে, কিন্তু তার অন্তর যদি হিংসা, অহংকার ও রিয়া (লোকদেখানো মানসিকতা) থেকে মুক্ত না হয়, তবে সেই আমল হবে ওই কাগজের ফুলের মতো, যার রং সুন্দর কিন্তু কোনো সুঘ্রাণ নেই। ঘ্রাণহীন ফুল যেমন প্রাণহীন ও আত্মশুদ্ধিহীন, ইবাদতও তেমনি আল্লাহর কাছে মূল্যহীন। আল্লাহ তাআলা বান্দার বাহ্যিক অবয়বের চেয়ে তার অন্তরের পবিত্রতাকেই বেশি প্রাধান্য দেন।
২. ধন-সম্পদ ও মোহ: একটি অলীক মরীচিকা
মানুষ দিনরাত পরিশ্রম করে পকেটে, ব্যাংকে বা গোপন অ্যাকাউন্টে অর্থ গচ্ছিত করে ভাবছে- ‘এ সম্পদ আমার’। বিলাসবহুল বাড়ি, দামি গাড়ি আর অলংকারে সে নিজেকে খুঁজে পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ভোগরত অবস্থায় বা আইনগত মালিক থাকা অবস্থায় মৃত্যু ঘটলেই সেই সম্পদের মালিকানা আর তার থাকে না। মুহূর্তেই তা ওয়ারিশ, ব্যাংক বা সরকারের হয়ে যায়।
দায়ভার কার? যদি এই সম্পদ সুদ, ঘুষ বা মিথ্যার আশ্রয়ে অর্জিত হয়, তবে তার ফল ভোগ করবে পরিবার-পরিজন, কিন্তু গুনাহের দায়ভার একাই বহন করতে হবে অর্জনকারীকে। এই মোহগ্রস্ত অন্তরের কারণেই মানুষ পরকাল ভুলে দুনিয়াকে প্রাধান্য দেয়। অথচ পরকালের জীবনই স্থায়ী ও সর্বোত্তম।
৩. পবিত্র কোরআনের দলিল
আল্লাহ তাআলা মানুষের আত্মাকে সুঠাম করেছেন এবং তাকে ভালো-মন্দের জ্ঞান দান করেছেন। সুরা আশ-শামসে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন- ‘শপথ নফসের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। এরপর তাকে অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন। অবশ্যই সেই সফলকাম হবে যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে। আর অবশ্যই সেই ব্যর্থ মনোরথ হবে যে নিজকে কলুষিত করবে।’ (সুরা শামস: ৭-১০)
হজরত মুসা (আ.)-কে যখন ফেরাউনের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তখন তাকে পরিশুদ্ধির দাওয়াত দিতে বলা হয়েছিল- ‘তাকে বলো, তোমার কি ইচ্ছা আছে যে, তুমি পবিত্র (পরিশুদ্ধ) হবে? আর আমি তোমাকে তোমার রবের দিকে পথ দেখাব, যাতে তুমি তাঁকে ভয় করো?’ (সুরা নাজিয়াত: ১৭-১৯)
৪. হাদিসের আলোকে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ও পরিশুদ্ধ অন্তর
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো- ‘কোন ব্যক্তি সর্বোত্তম?’ তিনি বললেন- প্রত্যেক বিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী সত্যভাষী ব্যক্তি। সাহাবিগণ বললেন, সত্যভাষীকে চিনি, কিন্তু বিশুদ্ধ অন্তরের ব্যক্তি কে? তিনি বললেন- ‘সে হলো পূত-পবিত্র, নিষ্কলুষ চরিত্রের মানুষ; যার মধ্যে কোনো পাপাচার, দুশমনি, হিংসা-বিদ্বেষ ও অহংকার নেই।’ (ইবনে মাজাহ)
রাসুলুল্লাহ (স.) আরও ইরশাদ করেছেন, দেহের ভেতরে একটি মাংসপিণ্ড (কলব) আছে; তা যদি ঠিক থাকে তবে পুরো দেহ ঠিক থাকে, আর তা নষ্ট হলে পুরো দেহ কলুষিত হয়। (বুখারি ও মুসলিম)
৫. আত্মশুদ্ধির দুটি দিক: বর্জন ও অর্জন
আত্মার পরিশুদ্ধি অর্জনের জন্য দুটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়-
মন্দ দিক বর্জন (আখলাকে সায়্যিয়াহ): শিরক, রিয়া, অহংকার, হিংসা, কৃপণতা, গিবত, দুনিয়ার মোহ এবং অন্যের অধিকার হরণ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। এটিই হলো আত্মার চিকিৎসা।
উত্তম গুণ অর্জন (আখলাকে হাসানা): তাওহিদ, ইখলাস (নিষ্ঠা), ধৈর্য, তাওয়াক্কুল, তওবা, কৃতজ্ঞতা, বিনয় এবং পরোপকারের মাধ্যমে শূন্যস্থান পূরণ করা।
৬. সম্পদকে জান্নাতের বাহন বানানোর উপায়
ইসলাম বৈরাগ্যবাদ সমর্থন করে না। সম্পদ থাকলেই তা অনর্থের মূল নয়, বরং সম্পদের সঠিক ব্যবহারই মুখ্য। গাড়ি যেমন ট্রাফিক আইন মেনে চললে গন্তব্যে পৌঁছায়, অর্থকেও তেমনি হালাল পথে অর্জন ও আল্লাহর পথে ব্যয় করলে তা জান্নাতের বাহন হয়। পরিবারের প্রয়োজনে ব্যয় করা, আর্তমানবতার সেবা এবং দ্বীন প্রচারে অর্থ ব্যয় করাই হলো সেই ‘উত্তম কর্জ’ যা আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন।
৭. রাসুলুল্লাহ (স.)-এর শেখানো দোয়া
আত্মশুদ্ধির জন্য আল্লাহর সাহায্য অপরিহার্য। রাসুলুল্লাহ (স.) সর্বদা আল্লাহর কাছে অন্তরের পবিত্রতা চাইতেন এবং এই দোয়াটি পাঠ করতেন-
اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا، وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا، أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلَاهَا উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আতি নাফসি তাকওয়াহা, ওয়া যাক্কিহা আনতা খাইরু মান যাক্কাহা, আনতা ওয়ালিইয়ুহা ওয়া মাওলাহা। অর্থ: ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার নফসে (আত্মায়) তাকওয়া দান করো এবং একে পরিশুদ্ধ করে দাও। তুমিই সর্বোত্তম পরিশোধনকারী, তুমিই এর অভিভাবক ও মালিক।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭২২)
পরিশেষে বলা যায়, নিশ্চয়ই সে-ই সাফল্য লাভ করবে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করবে, রবের নাম স্মরণ করবে এবং নামাজ আদায় করবে। পরিশুদ্ধ অন্তরের মাধ্যমেই একজন মুমিন সুউচ্চ মর্যাদা ও জান্নাত সুনিশ্চিত করতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিষ্কলুষ অন্তরের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।