নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরের ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, একটি বন্ধু সংগঠন নারীদেরকে ফ্যামেলি কার্ড দেয়ার কথা বলছেন, বলছেন এই কার্ড মহিলাদের হাতে দেয়া হবে। অন্যদিকে মা বোনেরা যখন অন্য কোনো দলের হয়ে বের হচ্ছেন তখন তাদেরকে লাঞ্ছিত করা হচ্ছে মারপিট করা হচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে ফ্যামেলি কার্ড, অন্যদিকে গায়ে হাত দেয়া হচ্ছে। এটি একটি জাতিকে বার্তা দেয়া হচ্ছে। আগামীতে যদি ওই দল ক্ষমতায় আসে তাহলে তাদের হাতে বাংলাদেশের একজনও মা বোনও নিরাপদ থাকবে না।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকালে যশোরের ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের আমির এ কথা বলেন।
তিনি উল্লেখ করেন, আমাদের কোনো মা বোন যদি নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গ করে তাহলে আপনারা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে বলুন। কিন্তু তাদের গায়ে হাত দেয়ার আপনি কে। আমরা মায়েদের সাথে কোনো অপমান সহ্য করবো না। আর যদি এ ধরনের কোনো আচরণ করা হয় তাহলে যেখানেই আঘাত হবে সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
জনসভায় শফিকুর রহমান বলেন, ইনশা আল্লাহ আল্লাহ-তাআলা যদি আমাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেন, আমরা এই যশোর সিটি করপোরেশনে উন্নীত করব, ৫শ’ বেড হাসপাতাল, ভবদহ সমস্যা সমাধান করা হবে। যশোরবাসীর এসব ন্যায্য অধিকার। পরে তিনি যশোরের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাদের হাতে দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ তুলে দেন।
তিনি বলেন, গণভোটে হ্যাঁ মানে আজাদী আর না মানে আবারে সেই গোলামী। হ্যাঁ ভোট বিজয়ী হলে বাংলাদেশ বিজয়ী হবে। না ভোট হলে বাংলাদেশ হেরে যাবে। না ভোট বিজয়ী হলে সরকার গঠন করে কোন লাভ হবেনা।
জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, আধিপত্যবাদমুক্ত, ন্যায় ও ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই। আল্লাহতা আলার ইচ্ছায়, তার সাহায্যে, জনগণের ভালোবাসায় ও জনগণের ভোটে জামায়াতে ইসলামী নির্বাচিত হলে সবাইকে নিয়েই আগামী পাঁচ বছর দেশ চালাতে চাই। আমরা বিভক্তির বাংলাদেশ চাই না। আমরা ঐক্যের বাংলাদেশ চাই।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, চাঁদার জ্বালায় অতিষ্ঠ জনগণ। এই চাঁদার কারণে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না, এই চাঁদার কারণে ভোক্তা ন্যায্যমূল্যে সে শাকসবজি কিনতে পারে না। চাঁদাবাজরা মাঝখানে ভাগ বসিয়ে দেয়, এর ভার পড়ে গিয়ে জনগণের ঘাড়ে। জুলাই শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী নির্যাতিত একটা মজলুম দল। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত একটা দল। জামায়াতের ইসলামীর কেউ গিয়ে মুদি দোকানির কাছে, রাস্তার পাশে বসা হকারের কাছে, ফকিরের কাছে চাঁদা চায়নি। যারা চেয়েছে তাদেরকে আমাদের সাথে নিয়ে আসবো। ভালোর পথে নিয়ে আসা হবে। আমরা অনেক নির্যাতন সহ্য করেছি। এত নির্যাতিত হওয়ার পরও নিজের হাতকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পেরেছে, এতেই বোঝা যায় জামায়াত ইসলামীর হাতেই আগামীর পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ নিরাপদ ইনশা আল্লাহ।
জামায়াতের আমির আরও বলেন, একটা দল সরকার আসার আগে ১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ার কথা বলছে। বলছেন কৃষককার্ড দেবে, দেবে বেকারভাতা। ওই সব ধোঁকা আর বাংলাদেশের জনগণ দেখতে চায় না। বেকারদের বেকারভাতা দিলে বেকারত্ব বেড়ে যাবে। আমরা নতুন নতুন কর্মসংস্থান তৈরী করে বেকারদেরকে সাবলম্বী করে তুলবো।
নারীদের ঘরে-বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করে শফিকুর রহমান বলেন, মায়েদের ইজ্জতের মূল্য জীবনের চেয়ে বেশি। মায়েদের কোনো অপমান আমরা বরদাস্ত করব না। কোনো লম্পটের জায়গা বাংলাদেশের জমিনে হবে না। এই ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স। মায়েরা ঘরে থাকবেন নিরাপদে, রাস্তায় বের হয়ে নিরাপদে চলাফেরা নিশ্চিত করা সরকারের অঙ্গীকার এবং দায়িত্ব। তারা নির্ভয়ে নিঃসংকোচে প্রশান্তি নিয়ে স্বস্তির সঙ্গে দেশ গড়ার কাজে পুরুষের পাশাপাশি অবদান রাখবেন।’
তিনি বেলা ৯ টা ১৮ মিনিটে মঞ্চে ওঠেন। পরে ৯টা ৪৩ মিনিটে বক্তব্য শুরু করে প্রায় ৩০ মিনিট বক্তৃতা দেন। এরআগেই নেতাকর্মীতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে ঈদগাহ ময়দান।
যশোর জেলা জামায়াতের আমি গোলাম রসুলের সভাপতিত্বে জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরোয়ার, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও যশোর-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মাও. আজিজুর রহমান, যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ, অঞ্চল টিম সদস্য ড. আলমগীর বিশ্বাস, নড়াইল জেলা আমীর আতাউর রহমান বাচ্চু, মাগুরা জেলা আমীর এম বি বাকের, বিশিষ্ট আইনজীবী ও যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অ্যাড. গাজী এনামুল হক, যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ভিপি আব্দুল কাদের, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যাপক মুক্তার আলী, মাও. হাবিবুর রহমান, যশোর জেলা সেক্রেটারি অধ্যক্ষ আবু জাফর সিদ্দিকী, জেলা সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক গোলাম কুদ্দুস, জেলা সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম, শহীদ আব্দুল্লাহর পিতা আব্দুল জব্বার, খেলাফত মজলিস যশোর জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুল¬াহ, এনসিপি দক্ষিণ অঞ্চল সংগঠক সাকিব শাহরিয়ার, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জেলা সেক্রেটারি, মাও. মাসুম বিল¬াহ, এনসিপি কেন্দ্রীয় সদস্য, খালিদ সাইফুল¬াহ জুয়েল, এনসিপি জেলা প্রধান সমন্বয়কারী, নুরুজ্জামান, খেলাফত মজলিস জেলা সহ-সভাপতি হাফেজ মাওলানা আশেক এলাহি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যশোর জেলা মুখ্য সমন্বয়ক আমানুল্লাহ আমান, শিবির যশোর শহর শাখার সভাপতি এ এইচ এম শামিম, শিবির যশোর জেলা পূর্ব শাখার সভাপতি আশিকুজ্জামান, শিবির যশোর পশ্চিম শাখার সভাপতি ইসমাইল হোসেন প্রমুখ।
এর আগে যশোরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভা ঘিরে বিপুল জনসমাগম দেখা যায়। জেলার ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দান পূর্ণ হয়ে ওঠে দলীয় নেতা-কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতিতে। ভোররাত থেকেই যশোর জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের এলাকা থেকে জামায়াতের নেতা-কর্মীরা দলে দলে শহরে জড়ো হতে শুরু করেন।
সকাল সাড়ে আটটার পর থেকেই ঈদগাহ ময়দানসহ আশপাশের এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। জনসভায় অংশ নেওয়া নেতা-কর্মীদের হাতে ছিল দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল¬া সম্বলিত প¬্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন। পুরো এলাকা জুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।
জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের উদ্দেশে কথা বলেন। তিনি জানান, নির্বাচনে জয়লাভ করলে দেশসেবার অংশ হিসেবে যশোরের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ সময় তিনি যশোরকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দেন।