নুরুল আলম চট্টগ্রাম।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ: জ্বালানি তেল-গ্যাসের দুর্দশার মুখে বাংলাদেশ
হরমুজ প্রণালি বন্ধ, লাখ টন ক্রুড নিয়ে আটকা ট্যাঙ্কার
এলএনজি সরবরাহও স্থগিত
জ্বালানি সাশ্রয়ের পরামর্শ সরকারের
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের জেরে বিশ্ব পরিবহন বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল (ক্রুড) নিয়ে আটকা পড়েছে বাংলাদেশের তেলবাহী একটি ট্যাঙ্কার।
একই সময়ে ইরানের হামলায় সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি কাতার এলএনজি সরবরাহও স্থগিত করেছে। ফলে এলএনজি আমদানিতে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ক্রুডবাহী ট্যাঙ্কারটি সময়মতো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। এতে অল্প সময়ের মধ্যে দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১৬ দিন চলার মতো পেট্রোল, ৩০ দিন চলার মতো অকটেন এবং ৭৬ দিনের মতো ফার্নেস তেল মজুত রয়েছে। তবে সবচেয়ে কম মজুত রয়েছে ডিজেলের। বর্তমানে যে মজুত আছে, তা দিয়ে মাত্র ১২ দিন সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। এর মধ্যে দেশে নতুন ক্রুড না পৌঁছালে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
সূত্র জানায়, সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে বিপিসির ক্রুডভর্তি করা অয়েল ট্যাঙ্কারটির নাম এমটি নরডিক পোলাক্স। বাংলাদেশ সময় ২ মার্চ ভোর ৫টায় ট্যাঙ্কারটি রাস তানুরা বন্দরে ভেড়ে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে জাহাজটিতে ক্রুড তেল ভর্তি করা শুরু হয় এবং ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টার মধ্যে ভর্তির কাজ শেষ হয়।
পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী ৩ মার্চ বিকেলে জাহাজটির চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা ছিল।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজটি বন্দরে অপেক্ষা করতে পারবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাস তানুরা বন্দর কর্তৃপক্ষ সে ক্ষেত্রে অনুমতি নাও দিতে পারে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বন্দরে ভিড়লেও জাহাজটি বন্দর ত্যাগ করতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না বিপিসি কিংবা জাহাজটির বাংলাদেশি শিপিং এজেন্ট।
বিপিসির ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) মণি লাল দাশ বলেন, ২ মার্চ ক্রুড তেল মাদার ট্যাঙ্কারে ভর্তির কথা ছিল। ৩ মার্চ এটি সৌদি আরবের বন্দর ত্যাগ করার সময়সূচি রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সময়মতো ক্রুড তেল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে কি না, তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকার সুযোগ নেই। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করে। তাই হয়তো বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ক্রুড নিয়ে ট্যাঙ্কার দেশে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগবে না।
জাহাজটির বাংলাদেশি শিপিং এজেন্ট প্রাইম ওশিয়ান ট্রেড লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, বিপিসি বছরে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করে। পরিশোধিত জ্বালানি তেল মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন উৎস থেকেও আমদানি করা হয়। ফলে সব ট্যাঙ্কারকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয় না।
তবে ক্রুড তেলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্রুড তেল আমদানি করে। সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল ধানা বন্দর থেকে এসব তেল আসে। এই দুটি বন্দর থেকে ক্রুডবাহী ট্যাঙ্কার হরমুজ প্রণালি ছাড়া বিকল্প কোনো সমুদ্রপথে আসতে পারে না।
তাই প্রণালিটি বন্ধ হলেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল আমদানিতে উদ্বেগ তৈরি হয়। ট্যাঙ্কার দেরিতে পৌঁছালে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) স্টোরেজ ট্যাঙ্কে থাকা ক্রুড ফুরিয়ে যেতে পারে। তখন জ্বালানি তেল উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকি তৈরি হবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধের ঝুঁকি
সৌদি আরব থেকে বিপিসি এবার আরব লাইট ক্রুড নামে পরিচিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করছে। প্রতি মাসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ক্রুড তেল আমদানি করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে মার্বান ক্রুড।
এই দুটি ক্রুড পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইআরএলের স্টোরেজ ট্যাঙ্কে সংরক্ষণ করা হয়। সেখান থেকে উৎপাদন করা হয় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল। পাশাপাশি উপজাত জ্বালানি হিসেবে উৎপাদিত হয় ন্যাফথা, বিটুমিন ও এলপিজি।
বর্তমানে সেচ মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল বিক্রি হচ্ছে দেশের বিভিন্ন ডিপো থেকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরএলের এক কর্মকর্তা বলেন, স্টোরেজ ট্যাঙ্কে এখনও কিছু ক্রুড মজুত রয়েছে। তবে চলতি মাসের মাঝামাঝি নতুন ক্রুড না পৌঁছালে সংকট দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, ক্রুড না থাকলে ইআরএলের উৎপাদন বন্ধ করে দিতে হতে পারে। এখন সারা দেশে সেচের ভরা মৌসুম। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে ইআরএলে ডিজেলের মজুত আছে মাত্র ১৪ দিনের।
এলএনজি আমদানিও স্থগিত, গ্যাস-বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ
ইরানের হামলায় সৌদি আরবের একটি বড় তেল শোধনাগার বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি কাতার এলএনজি সরবরাহ স্থগিত করেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশে প্রতিদিন ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার থেকে তা আরও ২০ কোটি ঘনফুট কমানো হয়েছে।
সার ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমানোয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সীমিত আকারে লোডশেডিং হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ হয় আমদানি করা এলএনজি থেকে। যুদ্ধের কারণে এই আমদানি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় জ্বালানি সাশ্রয়ের পরামর্শ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় খোলাবাজারে ডিজেল ও পেট্রোল বিক্রি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক শেষে মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, জ্বালানি সরবরাহ ধীর হয়ে গেছে। জ্বালানি না থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও সম্ভব হবে না। কিছুটা গ্যাস সংকট তৈরি হতে পারে, তবে লোডশেডিং অসহনীয় পর্যায়ে যাবে না বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, খোলাবাজার থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ঈদের ছুটিতে শিল্পকারখানা বন্ধ থাকলে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে, এতে কিছুটা চাপ কমতে পারে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার সংকটের চেয়েও ভয়াবহ। সবাই সাশ্রয়ী না হলে এই সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।