ধর্ম ডেস্ক
প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া মুমিনের অনন্য গুণ
মানুষ সামাজিক জীব। একে অপরের ওপর নির্ভরতা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই সমাজ টিকে থাকে। ইসলামি জীবনদর্শনে সমাজবদ্ধ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচার কেবল একটি সামাজিক শিষ্টাচার নয়, বরং এটি ঈমানের পূর্ণতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম প্রধান শর্ত। একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো- সে কেবল নিজের শান্তিতে সুখী নয়, বরং তার চারপাশের মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে সে সদা সচেষ্ট।
পবিত্র কোরআনের নির্দেশ
মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর ইবাদতের নির্দেশের ঠিক পরেই প্রতিবেশীর হক আদায়ের ওপর বিশেষ তাকিদ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে- ‘তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো পিতা-মাতার সঙ্গে, নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে, এতিম, মিসকিন, নিকটাত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সাময়িক পার্শ্ববর্তী সঙ্গী (যেমন সফর বা কর্মক্ষেত্রের সাথি), মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহংকারী।’ (সুরা নিসা: ৩৬)
নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১৯)
ঈমানের মাপকাঠি প্রতিবেশীর নিরাপত্তা
প্রতিবেশীর অধিকার যে কতটা ব্যাপক, তা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর একটি হাদিস থেকে স্পষ্ট হয়। জিবরাঈল (আ.) প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি তাকিদ দিচ্ছিলেন যে, নবীজি (স.)-এর মনে হয়েছিল- হয়তো শীঘ্রই প্রতিবেশীকে মিরাসের (উত্তরাধিকার) অংশীদার বানিয়ে দেওয়া হবে। (সহিহ বুখারি: ৬০১৪)
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়াকে ইসলামে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ হিসেবে দেখা হয়েছে। নবীজি (স.) তিনবার শপথ করে বলেছেন, ‘আল্লাহর শপথ! সে মুমিন নয়।’ জিজ্ঞাসা করা হলো- কে সেই লোক? তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১৬) এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি কথা ও কাজের মাধ্যমে প্রতিবেশীর অনিষ্ট সাধন করে, সে প্রকৃত ও পরিপূর্ণ ঈমানদার নয়।
ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীর খোঁজ রাখা
সামাজিক সংহতি রক্ষায় ইসলাম প্রতিবেশীর খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছে। আপনি পেট ভরে খেলেন অথচ আপনার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকল—এমন ব্যক্তিকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন বলা হয়নি। রাসুল (স.) বলেছেন- ‘সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট ভরে আহার করে অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (মুসতাদরাক হাকেম: ৭৩০৭)
পারস্পরিক হৃদ্যতা বাড়াতে আবু জার (রা.)-কে রাসুল (স.) অসিয়ত করেছিলেন, ‘হে আবু জার! যখন তুমি তরকারি রান্না করবে তখন তাতে পানি (শুরুয়া বা ঝোল) বেশি দিও এবং তোমার প্রতিবেশীকে কিছু প্রদান করো।’ (সহিহ মুসলিম: ২৬২৫
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি
প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরূপ আচরণ জান্নাত থেকে বঞ্চনা ও অভিশাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়-
জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়া: রাসুল (স.) ইরশাদ করেন, ‘যে লোকের প্রতিবেশী তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৬; মুসনাদে আহমদ: ৮৮৩৬)
অপরাধের সীমা: প্রতিবেশীর সঙ্গে কোনো অপরাধে (যেমন ব্যভিচার বা চুরিতে) লিপ্ত হওয়া অন্য ১০ জন সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেই অপরাধ করার চেয়েও বেশি গুরুতর। (মুসনাদে আহমদ: ২৩৮৫৪)
ইবাদত বিফলে যাওয়া: আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, জনৈক নারী অনেক নামাজ, রোজা ও সদকা করলেও মুখ দিয়ে প্রতিবেশীকে কষ্ট দিত- নবীজি (স.) তাকে ‘জাহান্নামি’ বলেছেন। অন্যদিকে কম ইবাদত করা সত্ত্বেও যে প্রতিবেশীর খোঁজ রাখত, তাকে ‘জান্নাতি’ ঘোষণা করেছেন। (মেশকাতুল মাসাবিহ: ৪৯৯২)
মন্দ প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা
প্রতিবেশী যদি পাপাচারী বা মন্দ স্বভাবের হয়, তবে ইসলামের নির্দেশনা হলো-
১. গোপন উপদেশ: প্রতিবেশীর পাপের বিষয়টি গোপন রেখে তাকে একাকী সংশোধনের উপদেশ দিতে হবে। (হুকুকুল জার, পৃষ্ঠা: ৩৯)
২. পাপাচার থেকে দূরত্ব: যদি প্রতিবেশী সুদ-ঘুষ, নেশা বা প্রকাশ্য গুনাহে লিপ্ত থাকে এবং উপদেশের পর সংশোধন না হয়, তবে তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।
৩. পরিবারের সুরক্ষা: প্রতিবেশীর পরিবারে অশ্লীলতা থাকলে নিজের স্ত্রী-কন্যাদের সেই বাড়িতে যাতায়াত থেকে বিরত রাখা এবং নিজের দৃষ্টির হেফাজত করা আবশ্যক।
৪. আশ্রয় প্রার্থনা: পরিস্থিতি অসহনীয় হলে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। নবীজি (স.) নিজেই খারাপ প্রতিবেশী থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। (সুনানে নাসায়ি: ৫৫১৭)
প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদত। আজকের আত্মকেন্দ্রিক সমাজে প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়ার এই শিক্ষা আমাদের সামাজিক ভাঙন রোধের সবচেয়ে কার্যকর পথ দেখায়। একটি আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া এবং তাদের হক রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য