উমংনু মারমা
রোয়াংছড়ি (বান্দরবান):
পাহাড়ি জনপদের প্রতিটি ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক অনন্য চিত্র—ছাদের আড়ায় ঝুলে থাকা বাঁশ ও বেতের তৈরি ঝুড়ি। বাহারি রঙ বা চাকচিক্য না থাকলেও এই ঝুলন্ত ঝুড়িগুলো পাহাড়ি সংস্কৃতি, জীবনযাপন ও ঐতিহ্যের এক নীরব সাক্ষী। আধুনিকতার ঢেউয়ে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও এখনো পাহাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য হয়ে আছে এই ঝুড়ি।
রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার রামথার বম পাড়ায় ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘরেই ঝুলছে এক বা একাধিক ঝুড়ি। কোথাও এতে রাখা হচ্ছে ধান, ভুট্টা বা শুকনো মরিচ, কোথাও আবার সংরক্ষিত হচ্ছে বীজ, কাপড় কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। পাহাড়ি ঘর সাধারণত মাচাংয়ের ওপর হওয়ায় মাটি ও আর্দ্রতা থেকে জিনিস রক্ষা করতে ঝুলন্ত ঝুড়ির ব্যবহার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, এই ঝুড়ি শুধু একটি ব্যবহার্য সামগ্রী নয়—এটি তাদের সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের অংশ। বম সম্প্রদায়ের প্রবীণরা জানান, ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ঝুড়ি বোনা শেখানো হয়। বাঁশ কাটা, বেত শুকানো, সুতোয় বুনন—সবকিছুতেই আছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা নিজস্ব কৌশল ও নান্দনিকতা।
রামথার বম পাড়ার বাসিন্দা এক নারী বলেন,
“আমরা বাজার থেকে প্লাস্টিকের কিছু কিনতে পারি, কিন্তু ঝুড়ির মতো টেকসই আর কাজে লাগার জিনিস নেই। নিজের হাতে বানানো ঝুড়িতে আমাদের বিশ্বাস আর মমতা জড়িয়ে থাকে।”
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের সহজলভ্যতা, তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়া এবং উপযুক্ত বাজার ব্যবস্থার অভাবে অনেক কারিগর এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে ঝুঁকছেন। তারপরও কিছু পরিবার এখনো আঁকড়ে ধরে রেখেছেন এই শিল্পকে—নিজেদের পরিচয় ও শেকড়ের টানে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে বাঁশ ও বেতের এই ঝুলন্ত ঝুড়ি পাহাড়ের একটি সম্ভাবনাময় কুটিরশিল্পে পরিণত হতে পারে। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করে এবং নকশায় সামান্য আধুনিক ছোঁয়া এনে দেশ-বিদেশের বাজারেও এর কদর বাড়ানো সম্ভব।
নীরবে ঝুলে থাকা এই ঝুড়িগুলো যেন পাহাড়ের মানুষের সংগ্রাম, সৃজনশীলতা আর ঐতিহ্যের কথা বলে যায়—কোনো উচ্চারণ ছাড়াই। আধুনিকতার ভিড়েও তারা মনে করিয়ে দেয়, সংস্কৃতি টিকে থাকে হাতের কাজে, স্মৃতিতে আর প্রজন্মের পর প্রজন্মের যত্নে।