উমংনু মারমা
স্থান: অবিচলিত বম পাড়া,
রোয়াংছড়ি, বান্দরবান
উন্নয়ন আর আধুনিকতার জোয়ার যখন পাহাড় থেকে সমতল—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক তখনো পাহাড়ের গভীরে কিছু জনপদ আছে, যেখানে জীবন চলে শতাব্দীপ্রাচীন নিয়মে।
বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার দুর্গম এলাকা অবিচলিত বম পাড়া এমনই এক জনপদ, যেখানে আধুনিকতার স্পর্শ এখনো পৌঁছাতে পারেনি পুরোপুরি। এখানে আজও টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী শ্রমজীবী মানুষের সহজ-সরল অথচ কঠিন জীবনসংগ্রাম।
ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় পাহাড়ি মানুষের কর্মব্যস্ততা। পুরুষরা যায় জুম চাষে, কেউ কেউ বাঁশ-বেত সংগ্রহে কিংবা পাহাড়ি পথ ধরে পণ্য বহনে। নারীরা ঘরের কাজের পাশাপাশি তাঁত বোনায়, জুমের ফসল প্রক্রিয়াজাত করে, আবার কেউ কেউ জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে। আধুনিক যন্ত্রের বদলে এখানকার শ্রম এখনো নির্ভর করে মানুষের শক্তি, অভিজ্ঞতা আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে আসা কৌশলের ওপর।
অবিচলিত বম পাড়ার শ্রমজীবীরা মূলত জুম চাষ, বাঁশ ও কাঠ সংগ্রহ, তাঁতশিল্প এবং ক্ষুদ্র কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়ি ঢালে জীবন ধারণ সহজ নয়—প্রতিদিনের কাজে রয়েছে ঝুঁকি, রয়েছে অনিশ্চয়তা। তবু প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই তারা গড়ে তুলেছে নিজেদের জীবনধারা। বিদ্যুৎ, পাকা রাস্তা কিংবা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এখনো এখানে সীমিত; চিকিৎসা ও শিক্ষার সুযোগও যথেষ্ট নয়।
গ্রামের প্রবীণরা জানান, সময় বদলালেও তাদের জীবনধারা খুব একটা বদলায়নি। আধুনিকতার সুবিধা যেমন ধীরে ধীরে শহরমুখী মানুষকে গ্রাস করছে, তেমনি পাহাড়ি এই জনপদে ঐতিহ্য আর শ্রমই এখনো জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হলেও অনেকেই থেকে যাচ্ছে পূর্বপুরুষের পেশা আঁকড়ে ধরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ি অঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী শুধু শ্রমের মাধ্যমে নয়, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের মাধ্যমেও দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করে। পরিকল্পিত উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব জীবনধারা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা জরুরি।
আধুনিকতার ছোঁয়ার বাইরে থাকা অবিচলিত বম পাড়ার এই শ্রমজীবী মানুষগুলো আজও প্রমাণ করে—প্রযুক্তি নয়, পরিশ্রম আর প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধনই তাদের জীবনের মূল শক্তি।