মিজানুর রহমান বাবুল
সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
২০২২ থেকে ২০২৫—এ তিন বছরে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি প্রতিবেশী দেশে শ্রীলংকা, বাংলাদেশ এবং নেপাল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পতিত হয়েছে দীর্ঘদিনের নিপীড়ক স্বৈরশাসকরা। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তারা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
২০২২ থেকে ২০২৫—এ তিন বছরে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি প্রতিবেশী দেশে শ্রীলংকা, বাংলাদেশ এবং নেপাল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পতিত হয়েছে দীর্ঘদিনের নিপীড়ক স্বৈরশাসকরা। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তারা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে স্বৈরশাসকের পতনই যে সংকটের সমাপ্তি তা নয়।
স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা একটি রাষ্ট্রকে এমন গভীর ও বহুমাত্রিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়, যার অভিঘাত ওই দেশের জনগণকে দীর্ঘদিন ধরে বহন করতে হয়। প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, নৈতিক অবক্ষয়, বিচার ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং সমাজে অনাস্থার সংস্কৃতি—এসবই স্বৈরশাসনের দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকার। তাই ফ্যাসিবাদী শাসকের পতনের পর জনগণ আন্তরিকভাবে দেশ পরিচালনার চেষ্টা করলেও ক্ষত পূরণে লেগে যায় বহু বছর। আবার কিছু ক্ষতি এমনই স্থায়ী হয়ে যায়, যা আর কখনই পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয় না।
স্বৈরাচার পতনের পর সাধারণত ন্যাশনালিস্টরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে উদ্যোগী হয়। কিন্তু রাতারাতি কোনো পরিবর্তন সম্ভব হয় না। কারণ ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে গণতন্ত্রকে নিঃশেষ করে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে এবং সমাজের ভেতরে বিভাজন ও ভয়ের সংস্কৃতি গেঁথে দেয়।
শ্রীলংকা, নেপাল ও বাংলাদেশ-এ তিন দেশের যদি আমরা কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস করি তাহলে অনেক সাদৃশ্য দেখতে পাব। এর মধ্যে অন্যতম মিল হলো নিপীড়ক শাসকদের পতনের পর জনগণ যাদের মনে করেছে যে এরা রাষ্ট্রকে ঠিক করতে পারবে, তারা অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছে। শ্রীলংকায় রাজাপাকসে পরিবারের শাসনের পতনের পর, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার এবং নেপালে শর্মা ওলির পতনের পর—এ তিন ক্ষেত্রেই জনগণের মধ্যে একটি সাধারণ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল যে জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো রাষ্ট্র পরিচালনায় নেতৃত্ব দিলে স্বৈরশাসনের আমলে সৃষ্ট ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে এবং দেশ স্থিতিশীল ও সঠিক পথে অগ্রসর হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ তিন দেশের মানুষ হতাশ হয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর এ তিন দেশের জনগণের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল পুরনো ও দমনমূলক রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে নতুন ও কার্যকর কাঠামোর নির্মাণ, যার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের হয়ে যাওয়া দীর্ঘ ক্ষয় ও ক্ষত পূরণ করা সম্ভব হবে। তবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়কাল বিবেচনা করলে বাংলাদেশের তুলনায় শ্রীলংকার পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। কারণ শ্রীলংকায় একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এসেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন তুলনামূলকভাবে তরুণরা। এ রাজনৈতিক পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে কর্তৃত্ববাদকে টিকিয়ে রাখা পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো ভাঙার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে গণ্য করা হয়। পাশাপাশি শ্রীলংকায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে আরো কিছু দৃশ্যমান অগ্রগতিও লক্ষ করা যায়, যা দেশটির গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সম্ভাবনাকে জোরদার করছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রত্যাশিত সংস্কার ও নতুন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান না হলেও জনগণের মধ্যে এ বিশ্বাস এখনো আছে যে সম্ভাবনার সুযোগ সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়নি। তাদের ধারণা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে সংস্কার হবে। এ কারণেই জনগণ গভীর প্রত্যাশায় একটি বিশ্বাসযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুণ্ন ও হরণ হওয়া নাগরিক অধিকারগুলো অন্তত আংশিকভাবে পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আদৌ সে ধরনের একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কিনা, কিংবা গণভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রত্যাশিত সংস্কারের পক্ষে মতামত জানানোর বাস্তব সুযোগ পাবে কিনা—তা নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে। এ সংশয়ের মূল কারণ হলো মাঠের রাজনীতিতে এরই মধ্যে অতীতের সহিংস ও দমনমূলক আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যেখানে একটি সহনশীল ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ প্রত্যাশিত ছিল, সেখানে হত্যা, নারী নির্যাতন, ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানাবিধ অপরাধ নিয়মিতভাবে সংঘটিত হচ্ছে। এ বাস্তবতা অব্যাহত থাকলে জনগণ আদৌ তাদের কাঙ্ক্ষিত শাসককে নির্বাচিত করার সুযোগ পাবে কিনা—সে বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সঙ্গে আশঙ্কা বাড়ছে যে অতীতের মতো এবারো তারা তাদের ভোটাধিকার কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হবে। ভোটাধিকার হরণের পরিণতি কী হতে পারে—তার ইতিহাস বাংলাদেশ একাধিকবার প্রত্যক্ষ করেছে; সেই অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতা-সিপাহি অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে। তারপর ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত এ দেশে কি ভয়ংকর নিপীড়ন হয়েছে তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসা এবং তার উত্থানের ইতিহাস পাঠের পাশাপাশি আমাদের এটাও রিভিজিট করা দরকার যে তার ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপট কীভাবে তৈরি হয়েছিল।
২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা, চরম দুর্নীতি এবং বিচারকদের অবসর বয়স রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা—এসবই তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের গুরুতর রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ভুল ও ব্যর্থতার উদাহরণ। এসব ব্যর্থতাকে সামনে রেখে ২০০৯ সালে একটি পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা হয়, যা জনগণের একটি বড় অংশ তৎকালীন বাস্তবতায় মেনে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত শেখ হাসিনার দল ও সরকারের দ্বারা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার হলেও জনগণ প্রত্যাশিত মাত্রায় তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। এর পেছনে নানা কারণ থাকলেও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল—২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের শাসনামল জনগণের একটা বড় অংশ মনে রেখেছিল।
তাই বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিএনপি-জামায়াতসহ জাতীয়তাবাদী ও ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি আবারো অতীতের একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে অর্থাৎ জনগণের সুস্পষ্ট ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ভিন্ন কোনো পথে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করে, ক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়াকে নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ বা নিশ্চিত করতে চায়, কিংবা কোনোভাবে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে—তাহলে এবারের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। জনগণ সংগ্রাম করবে এতে সন্দেহ নেই। সেই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই একসময় তারা রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিকানা পুনরুদ্ধার করবে। তবে সেই পথ হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিন্তু এ যাত্রায় বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এমন সংকট নেমে আসবে, যার মোকাবেলায় তারা জনগণকে পাশে পাবে না—এমনকি নৈতিক সমর্থন বা আগের মতো সহানুভূতিও পাবে না।