মোহাম্মদ আলাউদ্দিন।
বায়ান্নের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহিদের কথা আমরা জানি। তবে বাংলা ভাষার মার্যাদা রক্ষার দাবিতে ভারতের আসামে যে ১১ জন শহিদ হয়েছিলেন তাদের আত্মত্যাগের কথা আমাদের অনেকেরই অজানা। বায়ান্নের রক্তাক্ত আন্দোলনের ৯ বছরের মাথায় আসামের বরাক উপত্যকায় বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনে আধা সামরিক বাহিনীর গুলিতে শহিদ হন ১১ জন।
তাদের আত্মত্যাগের ফলে বরাক উপত্যকার কাছাড়, হাইল্যাকান্দি আর করিমগঞ্জ জেলায় বাংলাভাষা সরকারি ভাষার মর্যাদা পায়।
আসামে ভাষার লড়াই শুরু হয় ১৯৬০ সালের এপ্রিল মাসে। ওই সময় আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটিতে ‘অসমিয়া’ ভাষাকে প্রদেশের একমাত্র দাফতরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এরই প্রতিবাদে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে শুরু হয় ‘অসমিয়া’রা বাঙালি অভিবাসীদের আক্রমণ করে। জুলাই ও সেপ্টেম্বরে সহিংসতা চরম আকার ধারন করে। তখন প্রায় ৫০ হাজার বাঙালি হিন্দু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে যায়। আরও ৯০ হাজার বাঙালি পালিয়ে বরাক উপত্যকা ও উত্তর-পূর্বের অন্যত্র।
ন্যায়াধীশ গোপাল মেহরোত্রার নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের প্রতিবেদন বলা হয়, কামরূপ জেলার গোরেশ্বর অঞ্চলের ২৫টি গ্রামের ৪ হাজার ১৯টি কুঁড়েঘর এবং ৫৮টি বাড়ি ধ্বংস ও আক্রমণের শিকার হয়। এই জেলা সহিংসতার বিস্তার ছিল সবচেয়ে বেশি। ৯ জন বাঙালিকে হত্যা করা হয় এবং আহত হয় শতাধিক মানুষ। এরপর ১৯৬০ সালের ১০ অক্টোবর আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চলিহা ‘অসমিয়া’ ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ‘রাজ্য ভাষা বিল’ উত্থাপন করেন। উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক রণেন্দ্রমোহন দাস এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিধান সভায় বিলটি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হয়।
২৪ অক্টোবর সব সংশোধনী প্রস্তাব, অনুরোধ নিবেদন উপেক্ষা করে ‘রাজ্য ভাষা বিল’ বিধানসভায় গৃহীত হয়। উপেক্ষিত হয় রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলা। এরই প্রতিবাদে কয়েকজন বিধায়ক সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। এই আইনের মাধ্যমে একমাত্র ‘অসমিয়া’কে রাজ্যের সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বাঙালিরা, ক্রমশ তা রূপ নেয় আন্দোলনে। প্রথমে সত্যাগ্রহ, পরে সহিংস। বাঙালিদের ওপরে ‘অসমিয়া’ ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। আসাম সরকারের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ১৪ এপ্রিল শিলচর, করিমগঞ্জ আর হাইলাকান্দির মানুষ ‘সংকল্প দিবস’ পালন করেন। বরাকের জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করার জন্য এই পরিষদ ১৯৬১ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করে। এই পদযাত্রায় শত শত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় এবং দীর্ঘ ২২৫ মাইল পথ অতিক্রম করে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে তারা গ্রামগঞ্জের বিস্তৃত এলাকায় ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করে। ২ মে এই পদযাত্রা করিমগঞ্জ এসে পৌঁছালে এলাকার শত শত মানুষ তাদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। পদযাত্রা শেষে পরিষদের মুখপাত্র রথীন্দ্রনাথ সেন ঘোষণা করেন, যদি বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা না হয়, তা হলে ১৯ মে সর্বাত্মক হরতাল কর্মসূচি পালন করা হবে। আন্দোলন দমনে ১২ মে আসাম রাইফেল, মাদ্রাজ রেজিমেন্ট ও কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত পুলিশ বাহিনী শিলচরে ফ্ল্যাগ মার্চ করে। ১৮ মে আসাম পুলিশ আন্দোলনের তিন নেতা নলিনীকান্ত দাস, রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভূষণ চৌধুরীকে (সাপ্তাহিক যুগশক্তির সম্পাদক) গ্রেফতার করে।
১৯৬১ সালের ১৯ মে ভোর থেকে শিলচর, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দিতে হরতাল ও পিকেটিং শুরু হয়। করিমগঞ্জে আন্দোলনকারীরা সরকারি কার্যালয়, রেলওয়ে স্টেশন, কোর্ট ইত্যাদি এলাকায় পিকেটিং করেন। শিলচরে তারা প্রতিবাদ মিছিল করেন রেলওয়ে স্টেশনে। বিকাল ৪টার ট্রেনটি ছাড়ার সময় পার হওয়ার পর হরতাল শেষ করার কথা ছিল। ওই দিন ভোর ৫টা ৪০ মিনিটের ট্রেনটির একটিও টিকেট বিক্রি হয়েছিল না। সকালে হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে অতিবাহিত হয়।
কিন্তু দুপুরে শিলচর স্টেশনে আসাম রাইফেলের সদস্যরা অবস্থান নেয়। বেলা আড়াইটার দিকে পুলিশ কাটিগোরা এলাকা থেকে ৯ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করে। পুলিশের ট্রাকটি তারাপুর স্টেশনের (বর্তমানের শিলচর রেলওয়ে স্টেশন) পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষোভকারীরা এই ট্রাকের গতিরোধ করে।
এক পর্যায়ে পুলিশ ট্রাক ফেলে ট্রাকচালক ও বন্দিদের নিয়ে পালিয়ে যায়। এর পর কেউ একজন ট্রাকটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দমকল বাহিনী দ্রুত ঘটনা স্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এর কিছুক্ষণ পর স্টেশনে উপস্থিত আধা-সামরিক বাহিনী আন্দোলকারীদের ওপর গুলি চালায়। ৭ মিনিটের ভেতর তারা ১৭ রাউণ্ড গুলি করে। এতে ১২ জন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে ৯ জন সেদিনই নিহত হন; ২ জন পরে মারা যান। আধাসামরিক বাহিনীর গুলিতে নিহতরা হলেন- কানাইলাল নিয়োগী, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, হিতেশ বিশ্বাস, সত্যেন্দ্রকুমার দেব, কুমুদরঞ্জন দাস, সুনীল সরকার, তরণী দেবনাথ, শচীন্দ্র চন্দ্র পাল, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুকোমল পুরকায়স্থ এবং কমলা ভট্টাচার্য।
এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬১ সালে ‘সরকারি ভাষা’ আইন সংশোধন করে বাংলাকে অবিভক্ত কাছাড় জেলার সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।
উল্লেখ, ১৯৬১ সালের ১৯ মে বুকে গুলিবিদ্ধ কৃষ্ণকান্ত বিশ্বাস দীর্ঘ ২৪ বছর শারীরিক যন্ত্রণা ভোগের পর ১৯৮৫ সালে মারা যান। এ ছাড়া আসামে বাংলা ভাষার জন্য ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বিজন চক্রবর্তী নামে একজন শহিদ হন। ১৯৮৬ সালের ২১ জুলাই শহিদ হন আরও ২ জন। তারা হলেনÑ জগন্ময় দেব ও দিব্যেন্দু দাস। প্রতি বছর বরাক উপত্যকাসহ ভারতের বিভিন্নপ্রান্তে ১৯ মে ‘বাংলা ভাষা শহিদ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।
বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে আসামে শিলচরে যে ১১ জন নিহত হয়েছিলেন তাদের অধিকাংশেরই পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল পূর্ববাংলায়। তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিম্নে তুলে ধরা হলো-
এক. কমলা ভট্টাচার্য : বাংলাভাষা সংগ্রামের একমাত্র শহিদ কমলা ভট্টাচার্য মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েই ভাষা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৬ বছর বয়সে তিনি শহিদ হন।
দুই. শচীন্দ্রমোহন পাল : শচীন্দ্রচন্দ্র ১৯৪২ সালে সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার মদনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা গোপেশচন্দ্রের ৭ সন্তানের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন শচীন্দ্র; তারা ছিলেন ছয় ভাই ও এক বোন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় গণভোটের মাধ্যমে সিলেট জেলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। তার পরিবার শরণার্থী হিসেবে আসামে চলে আসতে বাধ্য হন। তারা সিলেটের পার্শ্ববর্তী আসামের কাছাড় জেলার শিলচরে এসে আশ্রয় নেন এবং স্থায়ীভাবে থাকা শুরু করেন।
তিন. কানাইলাল নিয়োগী : কানাইলাল নিয়োগীর জন্ম ১৯২৪ সালে ময়মনসিংহ জেলার কালিহাতী উপজেলার খিলদা গ্রামে। মেট্রিক পাশ করে ১৯৪০ সালে আসাম বেঙ্গল রেলে চাকরি নেন। পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির পর কানাইলাল আসামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে শহিদ হন।
চার. কুমুদ দাস : পিতা কৃষ্ণমোহন দাস মৌলভীবাজারের জুড়ী থেকে উদ্বাস্তু হয়ে কাছাড়ে যান। মায়ের মৃত্যুর পর ৮ বছর বয়সে কুমুদ দাস ত্রিপুরায় মামার বাড়িতে থেকে এম. ই. পর্যন্ত পড়ে গাড়িচালকের পেশা গ্রহণ করেন।
পাঁচ. তরণী দেবনাথ : ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সাতচল্লিশে ভারত বিভাগের সময় শিলচরে গিয়ে বসবাস শুরু করেন পিতা যোগেন্দ্র দেবনাথ। মৃত্যুকালে বয়ন ব্যবসায়ী তরণীর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর।
ছয়. হীতেশ বিশ্বাস : বাস্তুহারা হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে পিতৃহীন হীতেশ বিশ্বাস মাত্র ১২ বছর বয়সে ত্রিপুরার খোয়াই শহরের উদ্বাস্তু কলোনির বাসিন্দা হন। মা, ছোট ভাই ও এক বোনের সংসার ছিল তাদের। শিলচর শহরে ভগ্নীপতির বাসায় অবস্থানকালে মাতৃভাষার জন্য জীবনদান করেন।
সাত. চণ্ডীচরণ সূত্রধর : পিতৃহীন চণ্ডীচরণ সূত্রধর ১৯৫০ সালে হবিগঞ্জের জাকেরপুর গ্রাম থেকে মামার সঙ্গে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নেন শিলচরে। পড়াশোনা এম. ই. পর্যন্ত। জীবিকা হিসেবে পৈতৃক বৃত্তি কাঠমিস্ত্রির কাজেই নিয়োজিত করেন নিজেকে। মাত্র ২২ বছর বয়সে ভাষার জন্য আত্মদান করেন।
আট. সুনীল সরকার : ঢাকার মুন্সিবাজারের কামারপাড়া থেকে ভারত বিভাজনের বলি হয়ে শিলচর শহরের নূতন পট্টিতে গিয়ে ঘর বাঁধেন।
নয়. সুকোমল পুরকায়স্থ : করিমগঞ্জের বাগবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা পিতা সঞ্জীবচন্দ্র পুরকায়স্থ ডিব্রুগড়ে ব্যবসা করতেন। অসমিয়াকে একমাত্র রাজ্যভাষা করার আন্দোলনের নামে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় ১৯৫৯ সালে ‘বঙ্গাল খেদা’ অভিযানের শিকার হয়ে সপরিবারে স্বগ্রামে চলে আসেন। ভাষা সংগ্রামে আত্মাহুতি দিয়ে মাতৃভাষার ঋণ শোধ করেন সুকোমল।
দশ. বীরেন্দ্র সূত্রধর : বীরেন্দ্র সূত্রধরের জন্ম ১৯৩৭ সালে সিলেটের নবীগঞ্জের বহরমপুর গ্রামে। শৈশবে বাস্তুহারা হয়ে পিতামাতার সঙ্গে বহরমপুর গ্রাম থেকে শিলচর যান। জীবিকার অন্বেষণে বর্তমান মিজোরামের রাজধানী আইজল শহরে গিয়ে কাঠমিস্ত্রির পেশা অবলম্বন করেন। বিয়ে করেন ত্রিপুরার ধর্মনগরে। পরে কাছাড় জেলায় অবস্থিত মনিপুর চা বাগানের কাছে ঘর ভাড়া নেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে ১৮ বছরের স্ত্রী ও এক বছর বয়সি কন্যা রেখে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে আত্মদান করেন তিনি।