মিজানুর রহমান বাবুল
সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে অত্যন্ত জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, রুগ্ণ বেসরকারি খাত, দুর্বল রাজস্ব আয় এবং প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের চাপ তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমিত সম্পদ ও বিপুল জনপ্রত্যাশার মধ্যে সরকার কঠিন পথচলা শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মসূচি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।
এই সময়ের পদক্ষেপগুলো যদি বাস্তবভিত্তিক, অগ্রাধিকার নির্ধারিত এবং সাহসী হয়, তবে সেটিই হতে পারে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ।
সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার : বিভিন্ন দেশের নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসের অগ্রাধিকার দেখলে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জনকল্যাণ এবং সংস্কারই প্রধান ফোকাস। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের ঋষি সুনাক সরকারের প্রথম ছয় মাসে অগ্রাধিকার ছিল মূল্যস্ফীতি অর্ধেক করা, অর্থনীতি বৃদ্ধি, ঋণ কমানো, স্বাস্থ্যসেবা অপেক্ষার তালিকা হ্রাস এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ। সাম্প্রতিক লেবার সরকারের মাইলস্টোনগুলোতে অর্থনীতি বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সুযোগ সৃষ্টি এবং পরিচ্ছন্ন শক্তি অর্জন অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে ১.৫ মিলিয়ন বাড়ি নির্মাণ এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন।
ইন্দোনেশিয়ায় প্রাবোও সুবিয়ান্তোর নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অগ্রাধিকার ছিল খাদ্য নিরাপত্তা, শক্তি নিরাপত্তা, বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার, মানসম্পন্ন শিক্ষা-স্বাস্থ্য, জনগণের অর্থনীতি, দুর্নীতি নির্মূল এবং সামাজিক সুরক্ষা। নিউজিল্যান্ডে ন্যাশনাল পার্টির নতুন সরকার ব্যয় কমানো এবং বাজেট সঞ্চয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যখন কানাডায় বাজেট কাটছাঁট এবং পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন ফোকাসে। এসব উদাহরণে দেখা যায়, নতুন সরকারগুলো সাধারণত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, জনকল্যাণমুখী সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় জোর দেয়।
বাংলাদেশে সরকার গঠনের প্রথম দিনেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করে দিয়েছেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আগামী ১৮০ দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, জরুরি সমস্যাগুলো একটি সম্মানজনক পর্যায়ে আনতে কমপক্ষে এই সময় প্রয়োজন। এই মুহূর্তে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের সময়কালের দুর্নীতি-দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসনকাঠামো আর অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি, নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। ’
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অগ্রাধিকার পেতে পারে গণতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং জনকল্যাণ।
অর্থনৈতিকভাবে বন্ধ শিল্প পুনরুদ্ধার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা প্রত্যাহার সহজীকরণ এবং আইসিটি খাতে ১০ লাখ চাকরি সৃষ্টি অগ্রাধিকার হতে পারে।
গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইউনূস সরকারের সময়ে ঋণ বেড়েছে এবং উন্নয়ন ব্যয় সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বর্তমানে সরকারি আয়ের এক-পঞ্চমাংশ শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য সরকারের হাতে কম অর্থ থাকছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে, কিন্তু অর্থনীতির বর্তমান দুরবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া ও কর্মসংস্থান সংকোচনের কারণে রাজস্ব আদায়ে বড় ধাক্কা লেগেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে দুই লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও তিনটি প্রধান খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম ১৮০ দিনের পরিকল্পনায় অগ্রাধিকার দিতে হবে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের আস্থা ফেরানো, বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক নীতি গ্রহণ, পাশাপাশি মানুষের আয় বাড়াতে কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দিকে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের উত্তরাধিকার নোটে অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে নিম্নমানের কর আদায়, খেলাপি ঋণ, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা গেঁথে আছে অর্থনীতিতে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি কমছে, যার আঘাতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে। কর আদায় নিম্নমানের হচ্ছে, যে কারণে বড় ধরনের সংকট মোকাবেলায় সরকারের সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে নির্ভরতা বাড়ছে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর। বিপুল অঙ্কের ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে চাপের মুখে অর্থনীতি।
বেসরকারি খাতের চিত্র অত্যন্ত শঙ্কাজনক। দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির ২২-২৩ শতাংশের মধ্যেই আটকে আছে। কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যেখানে ভারতে তা প্রায় ১২ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১০ শতাংশ। মৌলিক সেবা টেকসইভাবে চালাতে এই অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া দরকার।
দেশের বর্তমান জনমিতিক কাঠামোতে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা তরুণ জনগোষ্ঠীর যে আধিক্য রয়েছে, তাকে কাজে লাগাতে কর্মসংস্থানের কোনো বিকল্প নেই। দেশে বছরে গড়ে ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থান হয় এবং প্রায় ছয় লাখ মানুষ বিদেশে যায়। কিন্তু আমাদের শ্রমবাজারে প্রতিবছর যে পরিমাণ নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে, তার তুলনায় এই সংখ্যা অপর্যাপ্ত।
কর্মসংস্থানের মূল উৎস হলো বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগ। কিন্তু দেড় বছর ধরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিনিয়োগের এই স্থবিরতা কাটাতে হলে সরকারকে দ্রুত কিছু সাহসী সংস্কার ও নীতি সহায়তা দিতে হবে।
বেসরকারি খাতে গতি আনতে নিয়মিত সংলাপ জরুরি। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অনেক রাষ্ট্রপ্রধান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত বসে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করেন, তাঁদের পরামর্শ শোনেন। নতুন সরকারেরও উচিত হবে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে তাঁদের সমস্যা সরাসরি শোনা এবং দ্রুত সমাধান দেওয়া। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে উদ্যোক্তাদের মনে আস্থা ফেরানো জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এরই মধ্যে সচিবদের উদ্দেশে বলে দিয়েছেন, ‘কে কোন দলের, কার কী সম্পৃক্ততা—এসব নয়, কাজের ক্ষেত্রে মেধা ও পেশাদারিই হবে একমাত্র মানদণ্ড। ’ এই বার্তা বেসরকারি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যদি প্রশাসনিক কাজে তা বাস্তবায়িত হয়। আইএমএফের পরামর্শ অনুসারে, ট্যাক্স রেভিনিউ মোবিলাইজেশন এবং ফিন্যানশিয়াল সেক্টর ভালনারেবিলিটি অ্যাড্রেস করলে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে উঠতে পারে।
এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন জরুরি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং ক্যাপিটাল শর্টফলের কারণে রিস্ট্রাকচারিং দরকার, যা বাজারের দক্ষতা বাড়াবে। সরকারের বাজেটে ব্যাংক থেকে উচ্চ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা প্রাইভেট ক্রেডিটকে আরো সীমিত করে। তাই অল্টারনেটিভ ফিন্যান্সিং সোর্স; যেমন—বন্ড মার্কেট উন্নয়ন করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং এফডিআই আকর্ষণের জন্য নীতি সংস্কার দরকার।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টার উত্তরাধিকার নোটে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজারব্যবস্থায় আস্থা পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া, এনবিআরের চলমান সংস্কার বাস্তবায়ন, কর অব্যাহতি পর্যালোচনা, আয়কর ব্যবস্থায় ডিজিটাইজেশন ও কাস্টমস আধুনিকায়নের পরামর্শ রয়েছে। পরবর্তী সরকারের উচিত নতুন কাজ শুরুর বদলে চলমান সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা।
সার্বিকভাবে নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কঠিন কাজ। সাহসী সংস্কার; যেমন—ট্যাক্স রিফর্ম, ব্যাংকিং গভর্ন্যান্স শক্তিশালীকরণ এবং প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে পার্টনারশিপ ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়। যদি প্রথম ১৮০ দিনে এদিকে ফোকাস করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরায় গতিশীল হতে পারে। অন্যথায় উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ঋণের চাপ জনগণের দুর্ভোগ বাড়াবে। এখন সময় সাহসী সিদ্ধান্তের।
ঋণের কিস্তি পরিশোধে বিদেশি ঋণের চাপ আগামী সময়ে আরো বাড়বে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১৫ শতাংশে না গেলে এই সরকারের অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে পড়বে।