ধর্ম ডেস্ক
পবিত্র রমজান উপলক্ষে দেশের প্রায় প্রতিটি মসজিদে ইফতারের আয়োজন করা হয়। এই দস্তরখানে যেমন রোজাদাররা অংশ নেন, তেমনি অনেক সময় শিশু, মুসাফির কিংবা অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে পারেননি এমন ব্যক্তিরাও উপস্থিত হন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, যিনি রোজা রাখেননি বা রাখতে পারেননি, তিনি কি মসজিদের এই সাধারণ ইফতার আয়োজনের অংশীদার হতে পারবেন?
আয়োজকদের নীরব সম্মতি ও সাধারণ অনুমতি
সমকালীন ফতোয়া বিশেষজ্ঞ ও হানাফি ফিকহের গবেষকদের মতে, কোনো ব্যক্তি রোজা না রেখেও মসজিদের ইফতার আয়োজনে অংশ নিতে পারেন। এর প্রধান কারণ হলো- সাধারণত যারা মসজিদে ইফতারের ব্যবস্থা করেন, তারা ‘রোজাদার ছাড়া কেউ খেতে পারবে না’ এমন কোনো কঠোর শর্ত সাধারণত আরোপ করেন না। শরিয়তের দৃষ্টিতে, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কোনো খাবারের আয়োজনে আয়োজকদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা না থাকলে সেখানে উপস্থিত হওয়া ও খাবার গ্রহণ করা অনুমোদিত।
দালিলিক ভিত্তি
এ বিষয়ে আলেমগণ রাসুলুল্লাহ (স.)-এর একটি সুন্নাহকে দলিল হিসেবে পেশ করেন। সুনানে আবু দাউদ-এ বর্ণিত হয়েছে- ‘তোমাদের কাউকে যখন খাবারের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং সে আমন্ত্রণকারীর প্রতিনিধি সঙ্গে আসে, তবে সেটাই তার জন্য অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৫১৯০)
প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা আলবানি (রহ.) তাঁর ‘ইরওয়াউল গালিল’ গ্রন্থে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন- ‘তোমাকে যখন আমন্ত্রণ জানানো হলো, তার অর্থই হলো তোমাকে খাবার গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” (ইরওয়াউল গালিল: ১৯৫৬)
যেহেতু মসজিদের ইফতার একটি ‘আম-দাওয়াত’ বা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত আপ্যায়ন, তাই সেখানে উপস্থিত হওয়া মানেই খাওয়ার প্রাথমিক অনুমতি থাকা।
কখন রোজা না রাখা ব্যক্তির জন্য খাওয়া অনুচিত?
সাধারণ অনুমতি থাকলেও বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে রোজা না রাখা ব্যক্তির জন্য মসজিদের ইফতার খাওয়া অনুচিত বা ক্ষেত্রবিশেষে নাজায়েজ হতে পারে-
১. খাবারের স্বল্পতা থাকলে: যদি খাবারের পরিমাণ সীমিত হয়, তবে ওই খাবারের ক্ষেত্রে রোজাদারদের অগ্রাধিকার বিবেচনা করা উচিত। রোজা না রাখা ব্যক্তি খাবার খেলে কোনো ক্লান্ত রোজাদার বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেখানে খাবার গ্রহণ করা নৈতিকভাবে সংগত হবে না।
২. আয়োজকদের সুনির্দিষ্ট শর্ত: যদি ইফতারের আয়োজক বা দানকারী স্পষ্ট করে বলে দেন যে, ‘এই ইফতার কেবল রোজাদারদের জন্য’, তবে রোজা না রাখা ব্যক্তির জন্য সেখান থেকে খাওয়া জায়েজ হবে না। ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, দান বা ওয়াকফের ক্ষেত্রে দাতার শর্ত পালন করা আবশ্যক।
একটি জরুরি সতর্কতা
শরয়ি কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ (যেমন: গুরুতর অসুস্থতা, সফর বা বার্ধক্য) ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ত্যাগ করা শরিয়তে অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ হিসেবে বিবেচিত। যারা ওজর ছাড়া রোজা রাখেন না, তাদের জন্য মসজিদের ইফতারে অংশ নেওয়া এক ধরনের নৈতিক সংকোচ ও আধ্যাত্মিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মোটকথা, আয়োজকদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বাধা না থাকলে এবং খাবার পর্যাপ্ত হলে রোজা না রাখা ব্যক্তিও ইফতার খেতে পারবেন। তবে রোজাদারদের অগ্রাধিকারের বিষয়টি সবার আগে মাথায় রাখা জরুরি। চূড়ান্ত ব্যক্তিগত ও বিশেষ পরিস্থিতির ক্ষেত্রে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উত্তম।