মোঃ কবির হোসেন, ভোলা:
শীতের আগমনের সঙ্গে একসময় গ্রামীণ জীবনে আনন্দের ছোঁয়া আনত খেজুর গাছের রস সংগ্রহ। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে হাঁড়িতে টপটপ করে পড়া রসের শব্দ আর মিষ্টি গন্ধে মুখর থাকত গ্রামবাংলা। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য প্রায় বিলীন। শহুরে ছোঁয়া ও অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ, ভুলে যাচ্ছে মানুষ সেই রসের প্রাকৃতিক মাধুর্য।
অতীতে হেমন্ত এলে গাছিদের ব্যস্ততা বেড়ে যেত। মাঠে, পুকুরপাড়ে কিংবা রাস্তার ধারে সারি সারি খেজুর গাছে রস সংগ্রহের আয়োজন থাকত। কোমরে দড়ি বেঁধে হাতে ধারালো দা নিয়ে গাছ কাটা ও হাঁড়ি বাঁধার দৃশ্য ছিল দেখার মতো। এখন আর সে দৃশ্য দেখা যায় না।
খেজুরের রসের মনমুগ্ধকর ঘ্রাণে সকাল হলেই শিশু, কিশোর, যুবক ও বৃদ্ধারা মিলে গাছের তলায় ঝড়ো হতেন। সেইসব দৃশ্য এখন তেমন একটা নেই বল্লেই চলে। এছাড়াও বহু পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহ করত খেজুর রস বিক্রির মাধ্যমে। এ উপজেলা থেকে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে জীবন ও জীবিকার তাগিদে অন্য সব পেশায় চলে যাচ্ছে। খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার একাধিক কারন আছে বলে মনেকরেন অভিজ্ঞ মহল ও গাছীরা। প্রথমত ইট পোরানো পাজায় খেজুর গাছ দিয়ে ইট পোড়ানো সহ কম খরচে গৃহ নির্মাণের কাজে খেজুরগাছ ব্যবহৃত হওয়ায় কমে আসছে গাছের পরিমাণ।
এছাড়াও আরও একটা অন্যতম কারণ হলো বৈদ্যুতিক লাইনের জন্য ডালপালা ছাটাইকরণের নামে খেজুর গাছের গোড়া বা অর্ধভাগ থেকে কর্তন। ইতিমধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খেজুর গাছের অস্তিত্বের উপর। এছাড়াও প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের কারণে গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় খেজুরের রস তেমন একটা পাওয়া যাচ্ছে না। যার ফলে এখন আর দেখা মেলে না শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে রসে বোঝাই হাঁড়ি কাঁধে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ফেরী করার সেই মনরোম দৃশ্য।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও কিছু গাছ টিকে থাকলেও বেশিরভাগ জায়গায় খেজুর গাছের অস্তিত্ব নেই। স্থানীয়রা জানান, আগের মতো রস পাওয়া যায় না। এখন গাছি খুঁজতে কয়েক গ্রাম ঘুরতে হয়।
টগবী ইউনিয়নের কামাল উদ্দিন বলেন,
“ছোটবেলায় দেখতাম পুরো এলাকা খেজুর রসের গন্ধে মাতোয়ারা থাকত। এখন গাছই নেই, গাছিও নেই।”
কুতুবা ইউনিয়নের সোহেল মিয়া বলেন,
“গাছ কমে গেছে, সঙ্গে গাছির সংখ্যাও। আগে যেভাবে রস পাওয়া যেত এখন আর পাওয়া যায় না।”
বড়মানিকা ইউনিয়নের গাছি মোঃ হোসেন জানান,
“প্রতিদিন বিকালে কলসি বাঁধি, সকালে রস সংগ্রহ করি। কিন্তু গাছ এত কমে গেছে যে কাজও কমে গেছে।”
বোরহানউদ্দিন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোবিন্দ মণ্ডল বলেন,
“একসময় পতিত জমি ও রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে খেজুর গাছ দেখা যেত, যা শুধু রসের উৎসই নয়, পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করত। কিন্তু এখন মানুষ গাছ কেটে নতুন করে আর লাগাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন,
“পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রতিটি সড়কের পাশে ও খালি জায়গায় খেজুর গাছসহ দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ জরুরি।”
গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক সেই খেজুর রস এখন শুধুই স্মৃতি। প্রকৃতি হারাচ্ছে তার নিজস্ব স্বাদ, মানুষ হারাচ্ছে মাটির টানে গড়া এক মধুময় ঐতিহ্য।