মুফতি সাইফুল ইসলাম
প্রতীকী ছবি
মানুষ ভুল করে, আবার পাপেও লিপ্ত হয়; তথাপি আল্লাহ তাআলার রহমত এমন অপরিসীম যে তিনি বান্দার প্রতিটি ত্রুটি ও গোনাহ প্রকাশ না করে ঢেকে রাখেন। দুনিয়ার এই পর্দা তাঁর মেহেরবানিরই এক অনন্য প্রকাশ। যদি আল্লাহ প্রতিটি গুনাহ মুহূর্তেই প্রকাশ করে দিতেন, তাহলে কেউ কারো সামনে মাথা উঁচু করে চলতে পারত না। কিন্তু আল্লাহ, যিনি ‘আস-সিতীর’—অর্থাৎ দোষ আড়ালকারী—তিনি বান্দাকে সুযোগ দেন ফিরে আসার, তাওবা করার, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার।
ইসলাম শুধু আল্লাহর দোষ-আড়াল করার গুণের কথা বলে থেমে যায়নি; বরং মানুষকেও শিক্ষা দিয়েছে অন্যের দোষ গোপন রাখার আদব। কেননা, সমাজ তখনই শান্ত থাকে, যখন মানুষ একে অপরের প্রতি পর্দা রক্ষা ও ক্ষমার নীতি অনুসরণ করে। এই প্রেক্ষাপটে আবু হুরাইরাহ (রা.) বর্ণিত নিচের হাদিসটি আল্লাহর দয়ার এক হৃদয়স্পর্শী ঘোষণা—
عَنْ أَبِيهِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ لاَ يَسْتُرُ اللَّهُ عَلَى عَبْدٍ فِي الدُّنْيَا إِلاَّ سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ” .
আবু হুরাইরাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে যে বান্দার দোষ-ত্রুটি লুকিয়ে রেখেছেন, কিয়ামত দিবসেও তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবেন।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৯০)
হাদিসের ব্যাখ্যা
আল্লাহর দোষ আড়াল করার গুণ ‘সিতর’
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, “এই হাদিসটি আল্লাহর ‘সিতর’ বা দোষ-আড়াল করার গুণকে প্রকাশ করে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার গোনাহ গোপন রাখেন, প্রকাশ করেন না, বরং দুনিয়াতে যেমন আড়াল করেন, কিয়ামতের দিনেও তাঁর রহমতের পর্দায় আবৃত রাখবেন।” (শরহ্ সহিহ মুসলিম, নববী, ১৬/১৩৫)
আরেক হাদিসে এসেছে
“إِنَّ اللَّهَ حَيِيٌّ سِتِّيرٌ يُحِبُّ الْحَيَاءَ وَالسَّتْرَ.”
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ লজ্জাশীল ও পর্দাকারী; তিনি লজ্জা ও পর্দা ভালোবাসেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪০১২) অর্থাৎ, আল্লাহর পর্দা রক্ষার এই গুণ তাঁর মেহেরবানির এক নিদর্শন।
দুনিয়াতে দোষ গোপন রাখার অর্থ
ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা যখন বান্দার দোষ গোপন করেন, তখন তিনি তার গুনাহ মানুষের সামনে প্রকাশ করেন না, অপমান থেকে রক্ষা করেন এবং তাকে তাওবার সুযোগ দেন।’ (ফাতহুল বারী, ১০/৪৮৪)
এ থেকে বোঝা যায়, দুনিয়াতে দোষ আড়াল করা মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাওবার সুযোগ দেওয়া।
কিয়ামতের দিনে দোষ আড়াল করার প্রতিশ্রুতি
এক অন্য হাদিসে এসেছে—
عَنْ صَفْوَانَ بْنِ مُحْرِزٍ الْمَازِنِيِّ قَالَ بَيْنَمَا أَنَا أَمْشِي مَعَ ابْنِ عُمَرَ آخِذٌ بِيَدِهِ إِذْ عَرَضَ رَجُلٌ فَقَالَ كَيْفَ سَمِعْتَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ فِي النَّجْوَى فَقَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ إِنَّ اللهَ يُدْنِي الْمُؤْمِنَ فَيَضَعُ عَلَيْهِ كَنَفَهُ وَيَسْتُرُهُ فَيَقُولُ أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كَذَا أَتَعْرِفُ ذَنْبَ كَذَا فَيَقُولُ نَعَمْ أَيْ رَبِّ حَتَّى إِذَا قَرَّرَهُ بِذُنُوبِهِ وَرَأَى فِي نَفْسِهِ أَنَّهُ هَلَكَ قَالَ سَتَرْتُهَا عَلَيْكَ فِي الدُّنْيَا وَأَنَا أَغْفِرُهَا لَكَ الْيَوْمَ فَيُعْطَى كِتَابَ حَسَنَاتِهِ وَأَمَّا الْكَافِرُ وَالْمُنَافِقُونَ فَيَقُولُ الأَشْهَادُ ( هَؤُلاَءِ الَّذِينَ كَذَبُوا عَلَى رَبِّهِمْ أَلاَ لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الظَّالِمِينَ
‘সাফওয়ান ইবনু মুহরিব আল-মাযিনী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি ইবনু ‘উমার (রা.)-এর সাথে তাঁর হাত ধরে চলছিলাম। এ সময় এক ব্যক্তি এসে বলল, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা ও তাঁর মু’মিন বান্দার একান্তে কথাবার্তা সম্পর্কে আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কী বলতে শুনেছেন? তখন তিনি বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তাআলা মু’মিন ব্যক্তিকে নিজের কাছে নিয়ে আসবেন এবং তার উপর স্বীয় আবরণ দ্বারা তাকে ঢেকে নিবেন।
তারপর বলবেন, অমুক পাপের কথা কি তুমি জান? তখন সে বলবে, হ্যাঁ, হে আমার প্রতিপালক! এভাবে তিনি তার কাছ হতে তার পাপগুলো স্বীকার করিয়ে নিবেন। আর সে মনে করবে যে, তার ধ্বংস অনিবার্য। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি পৃথিবীতে তোমার পাপ গোপন করে রেখেছিলাম। আর আজ আমি তা মাফ করে দিব’’। তারপর তার নেকের আমলনামা তাকে দেয়া হবে। কিন্তু কাফির ও মুনাফিকদের সম্পর্কে সাক্ষীরা বলবে, এরাই তাদের প্রতিপালক সম্পর্কে মিথ্যা বলেছিল। সাবধান, যালিমদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত। (বুখারি, হাদিস: ২৪৪১)
এটি আল্লাহর বান্দার প্রতি একান্ত স্নেহ ও রহমতের প্রতীক নয় কী?
কেন আল্লাহ দোষ ঢেকে রাখেন
মুহাদ্দিস আল-মুনাব্বি (রহ.) বলেন: ‘আল্লাহর দোষ আড়াল করা তাঁর দয়ারই অংশ। তিনি চান বান্দা যেন তাওবা করে, আত্মশুদ্ধির পথে ফিরে আসে।’ (ফয়দুল কাদির, ৫/২৫৫)
যদি মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেওয়া হতো, তবে কেউ আর সংশোধনের সুযোগ পেত না।
ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন, ‘যে অন্যের দোষ ঢাকে, সে আসলে আল্লাহর গুণ ‘সিতর’-এর অনুকরণ করে; আর যে অন্যের দোষ ফাঁস করে, সে সেই ঐশী গুণের বিপরীতে অবস্থান করে।. (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১১৬)
অতএব, মুমিনের উচিত অন্যের দোষ আড়াল করা, পর্দা রক্ষা করা ও সংশোধনের পথ দেখানো।
তবে কিছু ক্ষেত্রে অন্যের অপরাধ প্রকাশ করা বৈধ, যেমন—
অন্যদের ক্ষতি বা প্রতারণা থেকে বাঁচানো, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ইবনু তায়মিয়্যাহ (রহ.) বলেন, ‘ যখন কোনো অপরাধ প্রকাশ সমাজের স্বার্থে আবশ্যক হয়, তখন সেটি গোপন না রেখে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা-ই উত্তম।, (মাজমু’ আল-ফাতাওয়া, ২৮/২২২)
এই হাদীস আমাদের শেখায়
আল্লাহর একটি অনন্য গুণ হলো দোষ আড়াল করা। তিনি দুনিয়াতে যাকে রক্ষা করেন, কিয়ামতের দিনও তাকে রক্ষা করবেন। তাই মুমিনের উচিত নিজের গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং অন্যের দোষ প্রকাশ না করা।
কারণ, যে মানুষ অন্যের দোষ ঢাকে, তার দোষও আল্লাহ ঢেকে রাখেন। সমাজে যদি এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বিদ্বেষ নয়—করুণা, লজ্জা ও ক্ষমার সৌন্দর্যে পৃথিবী আলোকিত হয়ে উঠবে।