আতাউর রহমান খসরু
আরবদের সঙ্গে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সম্পর্ক ৫০০ বছরের বেশি সময়ের। ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয়রা শাম দেশ বা সিরিয়া হয়ে আরব অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল। দীর্ঘকালীন শাসনের মাধ্যমে তারা সমগ্র অঞ্চলে তাদের পদচিহ্ন রেখে গেছে। তবে আরবদের সঙ্গে উসমানীয়দের সম্পর্ক কখনোই সরল বা স্থিতিশীল ছিল না, বরং তা ছিল জটিল ও বহুরৈখিক রাজনৈতিক মেরুকরণে আবদ্ধ।
সময়, সমাজ ও অঞ্চল ভেদে তা ছিল বৈচিত্র্যময়। সাফাভিদদের বিরুদ্ধে উসমানীয়দের সংগ্রাম ও হেজাজ ভূমিকে পর্তুগিজ আক্রমণ থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে শাম অঞ্চলে উসমানীয়দের প্রবেশ করার বহু আগ থেকে আরবরা তাদের একটি ইসলামী শক্তি হিসেবেই বিবেচনা করত। তারা উসমানীয়দের সম্মান ও ভালোবাসার চোখে দেখত। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয়রা ইস্তাম্বুল জয় করার পর আরব মুসলিমদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও ভালোবাসার অভিব্যক্তি ছিল উপমাহীন।
কেননা উসমানীয়রা মহানবী (সা.)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়ন করেছিল।
বাগদাদে আব্বাসীয় খেলাফতের পতনের পর উসমানীয়দের উত্থানকে আরব জনগণের বড় একটি অংশ ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছিল। তারা ভেবেছিল একটি শক্তিশালী ইসলামী সাম্রাজ্যের উত্থান হলে স্থানীয় শাসকদের সংঘাত এবং অমুসলিম আগ্রাসন থেকে তারা রক্ষা পাবে। যদিও উসমানীয় সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণ ও কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এই চিন্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।
বলা যায়, উসমানীয়দের দীর্ঘ আরব শাসন যেমন ইসলামী খেলাফতের মূর্ত প্রতীক হিসেবে সমাদৃত হয়েছে, তেমনি দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসনের ছায়া হিসেবেও সমালোচিত হয়েছে।
বিপরীতে স্থানীয় শাসক গোষ্ঠী এবং একসময় শামসহ আরব অঞ্চল শাসন করা ইউরোপীয়রা উসমানীয়দের আরব শাসনকে কখনোই ভালো চোখে দেখেনি, বিশেষ করে ইউরোপীয়রা চাইত ইউরোপের ভূমিতে অগ্রসরমাণ উসমানীয়দের বিরুদ্ধে আরবরা তাদের সহযোগী হোক। তারাই তাদের লেখালেখি, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আরব অঞ্চলে আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটিয়েছিল, যার সহযোগী হয়েছিল ক্ষমতাপ্রত্যাশী স্থানীয় আরব গোত্রপতিরা।
জর্দানের বিখ্যাত ইতিহাস গবেষক মুহান্নাদ আল-মুবাইদিন উসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। তিনি বহু ঐতিহাসিক উৎস ও সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণ করেছেন।
উসমানীয় আমল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত ইতিহাসের বর্ণনা, বিভিন্ন আখ্যান, সাহিত্যের বিবরণ ও ঘটনাবলি অধ্যয়ন করেছেন। তিনি বলেন, আরব ভূখণ্ডে ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে উসমানীয়দের প্রবেশ ঘটে। তখন ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজদের হুমকি বেড়েছিল এবং আরব শহরগুলোতে বিভীষিকা তৈরি করেছিল। এটা উসমানীয়দের প্রবেশকে যৌক্তিক করে তুলেছিল। উসমানীয়দের আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র মামলুকদের ঐতিহাসিক তরবারির ওপর বিজয় লাভ করেছিল। তুর্কিদের সামরিক শক্তিমত্তা ও রাজনৈতিক উত্থানের বিবরণ সমকালীন ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়। যেমন—শায়খ আলওয়ান সুলতান সেলিমকে উপদেশ দিয়ে চিঠি পাঠান, তাতে তিনি সুলতান সেলিম বিন উসমানকে প্রজাদের প্রতি তাঁর দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। একই চিঠিতে নতুন শাসকদের কিছু আচরণের (শক্তিমত্তা প্রদর্শন) সমালোচনাও করেন।
উসমানীয় শাসনের ফলে সপ্তদশ শতাব্দীতে আরব শহরগুলোতে শান্তি ও স্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বহু ঐতিহাসিক তাঁদের সুদক্ষ শাসনের সাক্ষ্য দিয়েছেন। অনারব ঐতিহাসিকরাও আরব শহরগুলোর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবন যাপন ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে উসমানীয়দের প্রশংসা করেছেন। ভারতীয় ঐতিহাসিক আবদুল মালিক বিন হুসাইন ইসামি লিখেছেন, উসমানীয় শাসন ধার্মিক পূর্বপুরুষদের পথচলাকে দীর্ঘায়িত করেছিল। আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে আগ্রহী পারস্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও ব্রিটেনের মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে উসমানীয়দের সংগ্রামের ইতিহাস না জানলে আরব অঞ্চলের ইতিহাস বোঝা যাবে না।
আরব অঞ্চলে উসমানীয়রা ত্রাণকর্তা না দখলদার ছিল—এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না। সুবিশাল আরব অঞ্চলের সব প্রদেশে উসমানীয়দের অবস্থান ও শাসন এক রকম ছিল না। একেক অঞ্চলের মানুষ তাদের একেকভাবে গ্রহণ করেছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলের আরবরা উসমানীয়দের কখনোই ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তাদের কবিতা, সাহিত্য ও ইতিহাসে উসমানীয়দের নিন্দামূলক বিবরণে পূর্ণ। ১৭২৭ সালে প্রথম সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আরব উপদ্বীপের ব্যাপারে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সন্দেহ ও শঙ্কা তৈরি হয়। আল সৌদ পরিবারের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত হওয়ার পর উসমানীয়রা এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা স্থানীয়দের দৃষ্টিতে ছিল নিপীড়নমূলক। ইয়েমেনে কখনোই উসমানীয় সাম্রাজ্যের পা স্থির হতে পারেনি। ইয়েমেনের শিয়া জায়েদিরা উসমানীয় শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম দিন থেকেই প্রতিরোধ করে তুলেছে। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল তাদের সাহায্য করেছিল।
মিসরে উসমানীয় শাসন ছিল বেশ স্থিতিশীল। মিসরীয়রা তাদের মামলুকদের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত মিসরে তারা শাসনকার্য পরিচালনা করতে পেরেছিল। ইরাকের অবস্থাও ছিল অনেকটা মিসরের মতো স্থিতিশীল। মূলত ইরানের সাফাভিদরা ইরাক দখল করলে ইরাকি জনগণের আবেদনেই উসমানীয়রা শেখানে হাজির হয়েছিল। ইরাকিরা উসমানীয়দের স্বাগত জানিয়েছিল এবং তাদের শাসন মেনে নিয়েছিল। ফিলিস্তিন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে উসমানীয়রা স্থানীয় সামন্তবাদী নেতা ও ধর্মগুরুদের ওপর নির্ভর করেছিল। এতে এখানে শাসন স্থিতিশীল থাকলেও কখনো কখনো জনগণের ভেতর অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল। আলজেরিয়ার ঘটনা ছিল আরো অভূতপূর্ব। স্প্যানিশ হুমকি ও খ্রিস্টান নৌবহরের হুমকি বেড়ে যাওয়ায় আলজেরিয়ার শাসকগোষ্ঠী উসমানীয়দের নিজ দেশে আমন্ত্রণ জানায়। কেননা তত দিনে উসমানীয়রা ভূমধ্য সাগরে শক্তিমত্তার প্রমাণ দিতে সক্ষম হয়েছিল।
উনিশ ও বিশ শতকে আরব অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে উসমানীয় শাসনকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তখন উসমানীয়দের বিরুদ্ধে আরবের ক্ষমতাপ্রত্যাশী পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করতে শুরু করে। তাদের ইন্ধন ও সহযোগিতায় আরব অঞ্চলে উসমানীয় শাসনের পতন হয় এবং একাধিক স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন ঘটে। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এসে মুসলিমরা যখন খেলাফত ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলমানদের রাজনৈতিক শূন্যতা উপলব্ধি করতে পারল, তখন তাদের অনেকেরই পূর্বধারণা পরিবর্তন হতে শুরু করে। মিসরীয় ঐতিহাসিক আবদুল আজিজ আল শিন্নাভি লিখেছেন, আরবরা কখনোই উসমানীয় সাম্রাজ্যকে বিদেশি শক্তি বা তাদের শাসনকে ঔপনিবেশিক শাসন হিসেবে বিবেচনা করেনি। বিংশ শতাব্দীর গোড়া পর্যন্ত আরবদের ভেতর এই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক চিন্তারই প্রাধান্য ছিল।
আরব অঞ্চলে উসমানীয়দের দীর্ঘ শাসনের অন্যতম কারণ হলো, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্থানীয় আরবদের অন্তর্ভুক্তি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় আরবরাই উসমানীয়দের হয়ে অঞ্চল শাসন করত। যেমন বৈরুতের মালহাম পরিবার এবং দামেস্কের আল-আজম পরিবার। এরা ছিল আরবিভাষী উসমানীয়। এসব পরিবার স্থানীয় মানুষের মানসিকতা, ভাষা, সংস্কৃতি ও প্রত্যাশা সম্পর্কে অবগত ছিল।
তাহলে বলতে হবে, আরব অঞ্চলে শাসন নিষ্কণ্টক ও কালিমামুক্ত ছিল না। তাদের কোনো পদক্ষেপ আরবদের মনে এখনো গভীর ক্ষত হয়ে আছে। যেমন—সেনাপতি আহমেদ জামাল পাশার নির্মমতা। তিনি সিরিয়া ও লেবানন অঞ্চলে ‘বিদ্রোহ’ দমনের নামে নৃশংসতা চালান। এই অঞ্চলের মানুষ তাঁকে এখনো আল-সাফফাহ (কসাই) নামেই স্মরণ করে। এ ছাড়া শাম অঞ্চলে সামন্তবাদী শাসন এবং নির্ধারিত পরিবারের ওপর অতিনির্ভরতা আরব জনসাধারণের অধিকার ক্ষুণ্ন করেছিল বলেই বিশ্বাস করা হয়।
তথ্যসূত্র : ডেইলি সাবাহ, আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট আই