আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় রোদে শুকানো মাছ কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এক শ্রমিক/ খবরের কাগজ
শীতের নোনামাখা হাওয়া বইছে উপকূলে। ঝলমল রোদের নিচে সারি সারি মাছের ডালা। দূর থেকে মনে হয়, সাগরের বুকে রঙিন চাদর বিছানো। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার ফকিরহাট, ঘাটকুল আর উঠান মাঝির ঘাট এখন এক কর্মচঞ্চল শুঁটকি পল্লি। সারা দিন শুঁটকি প্রস্তুতের কাজ চলছে।
ঘাটজুড়ে শত শত শ্রমিক কাজ করছেন। কেউ জাল থেকে মাছ বাছাই করছেন। কেউ চিংড়ি ঝেরে ময়লা আলাদা করছেন। কেউবা কোরাল, সুরমা, লইট্টা, পোপা বা চিংড়ি মাচায় তুলে দিচ্ছেন রোদে শুকানোর জন্য। ছোট মেয়েরা বালতির পাশে বসে মাছ আলাদা করছে। নারী শ্রমিকরা শুকনো মাছ বস্তায় ভরছেন। চারদিকে মাছ, রোদ, বাতাস আর পরিশ্রমের গন্ধ এক ভিন্ন জগৎ।
ফকিরহাটের শ্রমিক হাসিনা বেগম বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করি। একেক দিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পাই। কঠিন কাজ, কিন্তু এই টাকাতেই ঘর চলে, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা হয়। শীতের সময়টাই আমাদের মৌসুম।’
উঠান মাঝির ঘাটের জেলে আমির হোসেন বলেন, ‘সকালে সাগরে যাই। বিকেলে মাছ আড়তে দিই। কেউ মাছ বিক্রি করে। কেউ শুকানোর কাজে লাগে। রোদ থাকলে ভালো শুঁটকি হয়। বৃষ্টি হলে নষ্ট হয়ে যায়। তবুও এই কাজই আমাদের জীবন।’
স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম জানান, ‘আগে শুঁটকি শুকানোর সময় দুর্গন্ধে থাকা যেত না। এখন অনেক পরিবর্তন এসেছে। পরিষ্কারভাবে কাজ হয়। প্রশাসনও নজর রাখে।’
ঘাটকুলের নারী শ্রমিক রেহানা আক্তার বলেন, ‘আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করতাম। এখন শুঁটকি ঘাটে কাজ করি। আয়ও ভালো হয়। রাসায়নিক ছাড়া প্রাকৃতিকভাবে শুকানো হয়। ক্রেতারাও খুশি থাকে। সরকারের সহযোগিতা পেলে আরও ভালোভাবে কাজ করা যেত।’
রোদে শুকানো মাছের সারি, প্লাস্টিকের ওপর মাছের স্তূপ, হাসি-ঠাট্টায় মগ্ন শ্রমিকদের ভিড়ে ঘাটে তৈরি হয়েছে আলাদা আবহ। শুকানো শেষে শুঁটকি বস্তায় ভরে ট্রাকে করে চট্টগ্রামের চাক্তাই, ঢাকা, নোয়াখালী, সিলেটসহ নানা জেলায় পাঠানো হয়। বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এ অর্গানিক শুঁটকি।
শুঁটকি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কাইয়ুম বলেন, ‘প্রতি মৌসুমে ২-৩ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। একেক প্লটে ৩০ থেকে ৩৫ জন শ্রমিক থাকেন। একেক ডালায় খরচ হয় লাখ টাকার বেশি। লাভও হয় এক থেকে দেড় লাখ টাকা। রাসায়নিক দিই না। পুরোপুরি প্রাকৃতিকভাবে শুকাই। তাই দেশের বাইরেও চাহিদা বাড়ছে।’
তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, কিছু ব্যবসায়ী দ্রুত শুকানোর জন্য অল্প পরিমাণ রাসায়নিক ব্যবহার করেন। এতে দেখতে ভালো লাগলেও স্বাদ ও গুণমান নষ্ট হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব কেমিক্যাল স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় ও রপ্তানির মান নষ্ট করে। তাদের দাবি, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে কিছু ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে এসব পাউডার ব্যবহার করেন।
ফকিরহাট শুঁটকি মহালের মালিক ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘রোদে শুকানো শুঁটকি সবচেয়ে ভালো হয়। আবহাওয়া ভালো থাকলে তিন থেকে পাঁচ দিনে শুকানো যায়। বড় মাছ নিতে পারে সাত দিন। আমরা কোনো কেমিক্যাল দিই না। তাই ভালো দাম পাই।’
উঠান মাঝির ঘাটের পাইকারি বিক্রেতা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সাগর থেকে চিংড়ি, কোরালসহ নানা মাছ এনে বিক্রি করি। শুঁটকি তৈরি হলে চাক্তাই বাজারে যায়। এক সপ্তাহে একটি মহাল থেকে চার-পাঁচ মণ শুঁটকি বিক্রি হয়।’
চাক্তাইয়ের আড়তদার আবদুল জলিল বলেন, ‘আনোয়ারার শুঁটকি এখন আলাদা নামে বিক্রি হয়। কারণ এগুলো অর্গানিক ও গন্ধে মিষ্টি। প্রবাসীদের কাছেও খুব জনপ্রিয়। প্রতি বছর রপ্তানি বাড়ছে।’
আনোয়ারা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রাশিদুল হক জানান, ‘গত বছর আনুমানিক ৩৫০ টন শুঁটকি উৎপাদন হয়েছিল। এবার আশা করছি ৫০০ টন ছাড়াবে। আমরা নিয়মিত জেলেদের সচেতন করছি যেন কেউ ডিডিটি বা কীটনাশক ব্যবহার না করে। ২০০ জন জেলেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিষমুক্ত শুঁটকি শুধু স্বাদেই ভালো নয়, স্বাস্থ্যসম্মতও।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘শুঁটকি শিল্প আনোয়ারার ঐতিহ্য। উপজেলা মৎস্য অফিস নিয়মিত তদারকি করছে। কেউ অবৈধ রাসায়নিক ব্যবহার করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।’