মাইমুনা আক্তার
প্রতীকী ছবি
মুসলমানদের হাজার বছরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বলতম কেন্দ্র ছিল মুসলিম স্পেন। স্পেনের এই সোনালি অধ্যায় সৃষ্টিতে যাঁরা অগ্রণী ছিলেন, তাঁরা হলেন এখানকার বিজ্ঞানী, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিক কর্মীরা। গোটা স্পেনই ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার এক আদর্শ ভূমি। প্রত্যেক শাসকই ছিলেন জ্ঞানানুরাগী ও বিদ্যোৎসাহী।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে স্পেন এমন এক স্বর্ণদ্বারে পরিণত হয়েছিল যে বিভিন্ন দেশ থেকে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসতেন বিদ্বানমণ্ডলী। ফ্রান্স, ইতালি, গ্যালিসিয়া, আফ্রিকা, সিরিয়া, মিসর, ইরাক, পারস্য প্রভৃতি দূর দেশ থেকে ছুটে আসতেন বিদ্যাভূষণ পণ্ডিত প্রবর কবি-সাহিত্যিকরা। তাঁরা সবাই এখানে সমাদরে অভ্যার্থিত এবং সরকারি বৃত্তিপ্রাপ্ত হতেন। সেই জ্ঞানানুরাগী ও বিদ্যোৎসাহী শাসকদের একজন ছিলেন তৃতীয় আবদুর রহমানের পুত্র দ্বিতীয় হাকাম।
ব্যক্তিগত জীবনে যিনি ছিলেন একজন অসাধারণ পণ্ডিত শাসক। অনেকের মতে, দ্বিতীয় হাকাম (৯৬১-৯৭৬ ইং) জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতায় স্পেনের সর্বশ্রেষ্ঠ খলিফা ছিলেন। স্পেনের সিংহাসনে এত বড় পণ্ডিত ও জ্ঞানানুরাগী আর কেউ আরোহণ করেননি। ইবনে খালদুন লিখেছেন, ‘হাকাম সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করতে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।
পণ্ডিত ব্যক্তিদের প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম বদান্যতা।’ জোসেফ ম্যাকেভ বলেন, ‘হাকাম আন্দালুসীয় সভ্যতার পরিপূর্ণতা অনায়ন করে কর্ডোবা নগরীকে ইউরোপের বুকে একটি বাতিঘরে পরিণত করেন।’
দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও সংরক্ষণকে তিনি যে কোনো মূল্যে অগ্রাধিকার দিতেন। গ্রন্থ লিখিত হওয়ার আগেই তিনি তা ক্রয়ের ব্যবস্থা করতেন। কেউ কোনো গ্রন্থ রচনার সংকল্প করেছেন এ কথা শুনলেই তিনি তাঁর জন্য মূল্যবান উপহার পাঠিয়ে দিতেন এবং তাঁর অনুরোধ থাকত যে পুস্তকের প্রথম কপিটিই যেন কর্ডোবায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
হাকাম কর্তৃক অনেক গ্রন্থকার পুরস্কৃত ও সমাদৃত হয়েছিলেন। এভাবে তিনি চার লাখ গ্রন্থ সংগ্রহ করেন।
হাকামের বিশাল লাইব্রেরিতে লাখ লাখ গ্রন্থরাজি সংরক্ষিত ছিল। শুধু গ্রন্থের তালিকার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল ৫০ খণ্ড পুস্তিকা। হাকাম সংগৃহীত প্রত্যেক গ্রন্থই পাঠ করতেন এবং অনেক গ্রন্থের পাশে নিজস্ব টীকা ভাষ্য লিখতেন। তাঁর পরবর্তীকালের মনীষীরা এসব ভাষ্য খুবই মূল্যবান বলে বিবেচনা করতেন।
হাকাম গ্রন্থাগার আন্দোলনের একজন পুরোধা। তাঁর মতো বই-পাগল নৃপতি পৃথিবীর ইতিহাসে খুব বেশি নেই। তাঁর নামে অসংখ্য গ্রন্থ উৎসর্গিত হয়েছিল। তাঁর গ্রন্থাগারের বর্ণনা দিতে গিয়ে ইবনে খালদুন লিখেছেন, আব্বাসীয় খলিফা আল নাসিরের গ্রন্থাগার ব্যতীত কোনো গ্রন্থাগারের সঙ্গে এর তুলনা হয় না। সমসাময়িক আরব পণ্ডিতরা এই দুর্লভ ও মূল্যবান সংগ্রহ সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। প্রচুর সংখ্যক কর্মচারী নিযুক্ত থাকা সত্ত্বেও এর বিপুল সংগ্রহ স্থানান্তর করতে দীর্ঘ ছয় মাস লেগেছিল।
[তথ্যঋণ : বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান (মুহাম্মদ নূরুল আমীন), পৃষ্ঠা-২৫১]