জিহাদুল ইসলাম(জিহাদ)
স্টাফ রিপোর্টার
মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকী হাফিজাহুল্লাহ।
প্রারম্ভ:বিবাহের আরবি শব্দ হলো নিকাহ।নিকাহ এর শাব্দিক অর্থ হলো,একত্রিত হওয়া,নারী পুরুষ মিলিত হওয়া। পারিভাষিক অর্থে নিকাহ বা বিবাহ বলা হয়।
ইসলামে বিবাহের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স নির্ধারণ করা হয়নি,বরং এটি স্বামী-স্ত্রীর সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ইসলামে বলা হয়েছে,যদি বয়স হয়ে যায়,অর্থাৎ ছেলে মেয়ে
বালেগ বালেগা হয়ে যায়,তাহলে বিবাহ জায়েজ। এতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
★কোরআন এর আলোকে বিবাহ…
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِنْ نِسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ.
[الطلاق/ الآية 4]
অনুবাদ:”আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে,যদি তোমরা সন্দেহে থাক,তবে তাদের ইদ্দত তিন মাস; এবং যারা এখনো মাসিকপ্রাপ্ত হয়নি,তাদেরও (ইদ্দত একই)।”
[সূরা-তালাক:৪]
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আবদুর রহমান সাদি রহ.বলেন—
“এখানে (اللائي لم يحضن) বলা হয়েছে,অর্থাৎ যারা এখনো ঋতুস্রাব পায়নি—অর্থাৎ ছোট মেয়েরা,যাদের এখনো ঋতুস্রাব হয়নি,এবং সেসব প্রাপ্তবয়স্ক নারী, যারা কোনো কারণে কখনো ঋতুস্রাব পায়নি। তাদের জন্যও ইদ্দতের সময় তিন মাস নির্ধারিত হয়েছে, ঠিক যেমন ঋতুবন্ধ নারীদের জন্য।”
[তাফসিরে-সা’দি,পৃষ্ঠা ৮৭০]
আল্লামা আবদুর রহমান আস-সাদির বক্তব্য দ্বারা বুঝা গেলো ঋতুস্রাব আসেনি এমন ছোট মেয়েদেরও বিয়ে হতে পারে। এই আয়াতে তাদের তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পরে ইদ্দত কথা বলা হয়েছে।বিয়েই যদি না হয় তাহরে তালাকা ও ইদ্দত কোত্থোকে
আসবে?এটি ইঙ্গিত বহন করে যে,ইসলামে বিয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো বয়স নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। দাম্পত্য জীবন পরিচালনার উপযোগী হলে ছোটছেলে-মেয়েদেরও বিয়ে হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন—
وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ. [النور:32]
অনুবাদ:“আর তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন,তাদের বিবাহ সম্পাদন করো এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও।তারা যদি গরিব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন।আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।”
[সূরা-নূর:৩২]
★হাদিসের আলোকে বিবাহ…
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
ﻳَﺎﻣَﻌْﺸَﺮَ ﺍﻟﺸَّﺒَﺎﺏِ ﻣَﻦِ ﺍﺳْﺘَﻄَﺎﻉَ ﻣِﻨْﻜُﻢُ ﺍﻟْﺒَﺎﺀَﺓَ ﻓَﻠْﻴَﺘَﺰَﻭَّﺝْ، ﻓَﺈِﻧَّﻪُﺃَﻏَﺾُّ ﻟِﻠْﺒَﺼَﺮِ ﻭَﺃَﺣْﺼَﻦُ ﻟِﻠْﻔَﺮْﺝِ ﻭَﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳَﺴْﺘَﻄِﻊْ ﻓَﻌَﻠَﻴْﻪِﺑِﺎﻟﺼَّﻮْﻡِ ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻟَﻪُ ﻭِﺟَﺎﺀٌ
অনুবাদ:হে যুবসমাজ! তোমাদেরমধ্যে যারা বিবাহের সামর্থ্য রাখে, তাদের বিবাহ করা কর্তব্য। কেননা বিবাহ হয় দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণকারী, যৌনাঙ্গের পবিত্রতা রক্ষাকারী। আর যার সামর্থ্য নেই সে যেন রোজা পালন করে। কেননা রোজা হচ্ছে যৌবনকে দমন করার মাধ্যম।
[বুখারী,৫০৬৫:
মুসলিম,১৪০০]
হাদিসে এসেছে..
وقد تزوج النبي صلى الله عليه وسلم عائشة رضي الله عنها وهي بنت ست سنين ، وأُدخلت عليه وهي بنت تسع
অনুবাদ:মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম,আয়েশা (রাযি.)-কে ছয় বছর বয়সে বিবাহ করেন এবং নয় বছর বয়সে তাকে দাম্পত্য জীবনে গ্রহণ করেন। [সহিহ বুখারি: ৪৮৪০,সহিহ মুসলিম:১৪২২]
অতএব,ইসলামে বিবাহের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই, বরং এটি সামর্থ্য, সুস্থতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভরশীল।
ইসলামে ছেলের জন্য বিয়ের উপযুক্ত সময় হল,যখন সে দাম্পত্য জীবন পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করে।মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম,এই পর্যায়ে পৌঁছালে বিয়ে করার নির্দেশনা দিয়েছেন এবং এটি যে দৃষ্টি সংযত রাখা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য সহায়ক।
অর্থ সংকটের কারণে কেউ যদি বিয়ে করতে দেরি করে,তবে সে যেন চিন্তিত না হয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তিকে নিজের অনুগ্রহে সম্পদশালী করবেন,যে বৈধ পথে পবিত্র জীবন যাপন করতে চায়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
المجاهد في سبيل الله، والمكاتب الذي يريد الأداء، والناكح الذي يريد العفاف. رواه أحمد والنسائي والترمذي وابن ماجه
অনুবাদ:“তিন শ্রেণির লোকের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য নিশ্চিত:(১) আল্লাহর পথে জিহাদকারী,(২) মুক্তিপ্রাপ্ত দাস,যে মুক্তির জন্য চেষ্টা করছে,এবং(৩) সেই ব্যক্তি,যে নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায়।” [তিরমিজি, নাসায়ি,ইবনে মাজাহ]
প্রশ্ন:পিতা মাতার অনুমতি ব্যতীত বিবাহ করলে বিয়ে হবে কি না?
উত্তর:শরয়ী দৃষ্টিকোণে বিবাহ সহিহ হওয়ার জন্য কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে। সেই শর্তগুলো পাওয়া গেলেই বিবাহ সহিহ হয়ে যায়। পক্ষান্তেরে তার কোনো একটি শর্তের অনুপস্থিতি শরিয়ত মোতাবেক নিকাহ অশুদ্ধ হয়ে যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মৌলিক শর্ত হচ্ছে-
১. বর-কনের ইজাব কবুল দুজন যোগ্য সাক্ষীর সামনে সম্পাদন হওয়া। ইজাব যেসব সাক্ষীর সামনে হবে; কবুল ঠিক সেই সাক্ষীদের উপস্থিতিতেই হতে হবে।
২. সাক্ষীদ্বয় বর-কনের ইজাব-কবুল সরাসরি শুনতে হবে।
৩. ইজাব ও কবুল একই বৈঠকে সম্পাদন হওয়া আবশ্যক।
৪. ইজাব-কবুল উভয় সাক্ষীর একসঙ্গে শুনতে হবে।
★সুতরাং ছেলে মেয়ে উভয়ে যদি প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক সাক্ষ্যির উপস্থিতিতে বিয়ের প্রস্তাব ও প্রস্তাব গ্রহণ সম্পন্ন করে থাকেন,তাহলে তাদের বিয়ে ইসলামী শরীয়া মুতাবিক শুদ্ধ হয়ে গেছে। যদিও তাদের পরিবার কিছুই জানে না। কিংবা যদি তারা অনুমতি নাও দিয়ে থাকে।
১নং দলিল…
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَبَّاسٍ؛ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم، قَالَ: «الْأَيِّمُ أَحَقُّ بِنَفْسِهَا مِنْ وَلِيِّهَا.
অনুবাদ:হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন,মেয়ে তার ব্যক্তিগত বিষয়ে অভিভাবকের চেয়ে অধিক হকদার।
{মুয়াত্তা মালিক,হাদীস নং-৮৮৮,সহীহ মুসলিম,হাদীস নং-১৪২১, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৮৮৮, সুনানে আবু দাউদ,হাদীস নং-২০৯৮, সুনানে দারেমী,হাদীস নং-২২৩৪,সুনানে তিরমিজী,হাদীস নং-১১০৮,সুনানে নাসায়ী,হাদীস নং-৩২৬০,সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৪০৮৪, সুনানে দারাকুতনী, হাদীস নং-৩৫৭৬}
২নং দলিল…
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ قَالَ: ” جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَتْ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنَّ أَبِي وَنِعْمَ الْأَبُ هُوَ، خَطَبَنِي إِلَيْهِ عَمُّ وَلَدِي فَرَدَّهُ، وَأَنْكَحَنِي رَجُلًا وَأَنَا كَارِهَةٌ. فَبَعَثَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى أَبِيهَا، فَسَأَلَهُ عَنْ قَوْلِهَا، فَقَالَ: صَدَقَتْ، أَنْكَحْتُهَا وَلَمْ آلُهَا خَيْرًا. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا نِكَاحَ لَكِ، اذْهَبِي فَانْكِحِي مَنْ شِئْتِ
অনুবাদ:হযরত সালামা বিনতে আব্দুর রহমান রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক মেয়ে রাসূল সাঃ এর কাছে এল। এসে বলল,হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা! কতইনা উত্তম পিতা! আমার চাচাত ভাই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল আর তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। আর এমন এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চাইছেন যাকে আমি অপছন্দ করি। এ ব্যাপারে রাসূল সাঃ তার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলে পিতা বলে,মেয়েটি সত্যই বলেছে। আমি তাকে এমন পাত্রের সাথে বিয়ে দিচ্ছি যার পরিবার ভাল নয়। তখন রাসূল সাঃ মেয়েটিকে বললেন,“এ বিয়ে হবে না,তুমি যাও, যাকে ইচ্ছে বিয়ে করে নাও”।
{সুনানে সাঈদ বিন মানসূর,হাদীস নং-৫৬৮,মুসন্নাফে আব্দুর রাজ্জাক,হাদীস নং-১০৩০৪, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-১৫৯৫৩, দিরায়া ফী তাখরীজি আহাদিসীল হিদায়া,হাদীস নং-৫৪১}
★গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট.. হানাফী মাযহাব অনুযায়ী
মেয়েদের ক্ষেত্রে যদি মেয়ে নাবালিকা হয় অবশ্যই অভিবাবক এর অনুমতি লাগবে আর যদি মেয়ে বালেগা হয় তাহলে অভিবাবক এর অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করলে হয়ে যাবে। ছেলেদের ক্ষেত্রে অভিবাবক ছাড়া বিয়ে করলে হয়ে যাবে।