ইকবাল কবীর মোহন
উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের দেশ আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিন। এর আয়তন ৩২ হাজার ৫৯৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ৪৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৬৫ জন। আয়ারল্যান্ড একটি উন্নত দেশ, যার জিডিপির আকার ৩৪৫ বিলিয়ন এবং মাথাপিছু আয় ৭২ হাজার ৬৩২ মার্কিন ডলার।
পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আয়ারল্যান্ডেও রয়েছে মুসলিম অধিবাসী। পশ্চিমের অন্যান্য দেশের চেয়ে এখানে কম বয়সের মুসলমানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুসারে, আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রে প্রায় ৮৩ হাজার ৩০০ জন মুসলিম বাস করে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় ২৯.১ শতাংশ বেশি। দেশটিতে প্রায় ৫০টি মসজিদ ও প্রার্থনা কেন্দ্র রয়েছে এবং মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য স্কুলে হিজাব পরাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান।
দি ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুকের তথ্য মতে, আয়ারল্যান্ডে রোমান ক্যাথলিক ৬৮.৩ শতাংশ, প্রোটেস্ট্যান্ট ৩.৮ শতাংশ, অর্থোডক্স ২ শতাংশ, খ্রিস্টান ০.৯ শতাংশ, মুসলিম ১.৪ শতাংশ এবং অন্যান্য ১.৬ শতাংশ (২০২২ সালের আনুমানিক)
আয়ারল্যান্ডের মুসলিম অধিবাসীদের মধ্যে নানা বর্ণের ও এলাকার সমাবেশ লক্ষ করা যায়। অতীতে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো থেকে এখানে মুসলমানদের আগমন ঘটে। শিক্ষার প্রয়োজনে অথবা জীবিকার সন্ধানে মুসলমানরা এখানে আসে। তাদের অনেকেই দেশটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করার ব্যবস্থা করে।
অনেকে আবার আইরিশ মেয়েদের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আয়ারল্যান্ডের নাগরিকত্ব লাভ করে। ১৯৯০ সালের শুরুতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও বলকান এলাকা থেকে মুসলমানরা আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমায়। এর মধ্যে অনেকেই অভিবাসী এবং অন্যরা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রত্যাশী। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে নাইজেরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, সোমালিয়া, আলজেরিয়া ও অন্যান্য দেশের মুসলমানরা রয়েছে। আইরিশ অধিবাসীদের মধ্য থেকে কেউ কেউ নও-মুসলিমও সেখানে রয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের মুসলিম জনসংখ্যার বেশির ভাগ সুন্নি মতাবলম্বী। তবে দেশটির রাজধানী ডাবলিনে শিয়া মতবাদের অনেক মুসলমান আছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো এখানকার ধর্মীয়ভাবে বিভাজিত গোষ্ঠীর মধ্যে তেমন কোনো সমস্যা নেই, বরং এখানকার নানা জাত, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে সুন্দর ও অনাবিল সম্পর্ক বিদ্যমান।
আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে মুসলমানদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আছে, যার নাম ইসলামিক কালচারাল সেন্টার অব আয়ারল্যান্ড। এটি চার একর জমির ওপর অবস্থিত একটি কমপ্লেক্স। এখানে একটি স্কুল আছে। এটি ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দুবাইয়ের উপ-শাসক ও আরব আমিরাতের অর্থমন্ত্রী শেখ হামদান বিন রাশিদ আল-মাকতুম পরিচালিত ‘আল-মাকতুম ফাউন্ডেশন’-এর জন্য আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন। মাকতুম পরিবারের সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের ব্যাবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। ডাবলিনের এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ২০ জন কর্মকর্তা কর্তব্যরত আছেন, যাঁরা বেশির ভাগই আরব অধিবাসী। এদের সব খরচ আল-মাকতুম ফাউন্ডেশন বহন করে। কেন্দ্রটির পরিচালক হলেন ড. নূহ আল-কাদ্দু। তিনি ইরাকের অধিবাসী। কেন্দ্রটি পরিচালনা করার জন্য নূহ ১৯৯৭ সালে ব্রিটেন থেকে ডাবলিনে গমন করেন। আয়ারল্যান্ডের বেশির ভাগ মুসলমান কালচার সেন্টারটিকে ‘ইখওয়ানি মসজিদ’ বলে উল্লেখ করে থাকে। ইখওয়ান আরবি শব্দ, যেটি মিসরের ইসলামী আন্দোলন ‘ব্রাদারহুড’ নামে পরিচিত। তবে আয়ারল্যান্ডে ব্রাদারহুডের মনোভাবাপন্ন অনেক মুসলমান আছে, যারা শুধু এখানেই নয়, সারা ইউরোপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এবং তারা ইসলামের কাজে অগ্রসর ভূমিকা পালন করছে।
২০০৯ সালে সৌদি সরকার আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে তার দূতাবাস খুলেছে। এর ফলে দেশটিতে মুসলমানদের জন্য একটি নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। দূতাবাসের কর্মকর্তারা ডাবলিনে একটি স্কুল ও একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন। ব্লানচার্ডটাউনে অবস্থিত আল-মোস্তফা ইসলামিক সেন্টারের ইমাম উমর কাদরী বলেন, ‘যদি স্কুল ও মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তা হলে এটি হবে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর ফলে আয়ারল্যান্ডে একটি বড় প্রভাব পড়বে।’
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আয়ারল্যান্ডে মুসলিম জনসংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। মুসলমানরা সেখানে আরো সংহত ও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আমরা আশা করি, ইসলামের কাজ ধীরে হলেও আয়ারল্যান্ডে বিস্তার লাভ করবে। আগামী দিনগুলোতে দেশটিতে মুসলমানরা আরো বেশি প্রভাব বিস্তার করুক—এ প্রত্যাশাই আমরা করছি।