বেলায়েত হুসাইন
হিংসা সবচেয়ে নিকৃষ্ট গুনাহ
হিংসা মানে হলো অন্যের সুখ-সামর্থ্য দেখে মনে জ্বালা অনুভব করা এবং এই কামনা করা যে, তার পাওয়া সুখ-সমৃদ্ধি নষ্ট হয়ে আমার কাছে চলে আসুক। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অন্যের সুখ ও নেয়ামত দেখে জ্বলে, তাকেই হিংসুক বলা হয়। সে সহ্য করতে পারে না যে, আল্লাহ কাউকে সম্পদ, জ্ঞান, দ্বীনদারিতা, সৌন্দর্য বা অন্য কোনও নেয়ামতে সিক্ত করেন।
অনেক সময় এই অনুভূতি শুধু হিংসুকের মনে থাকে। আবার কখনও কখনও হিংসার অনুভূতি এতটাই তীব্র হয় যে, হিংসুক যার প্রতি হিংসা করছে তার বিরুদ্ধে কোনও বাস্তব পদক্ষেপও নিয়ে ফেলে। কখনও তার কথা-বার্তায় আবার কখনও তার আচরণে এই পদক্ষেপ ও জ্বলন প্রকাশ পায়।
হিংসা যতক্ষণ কারও অন্তরে লুকিয়ে থাকে, ততক্ষণ তা অন্যের ক্ষতি করে না; বরং সেই হিংসা হিংসুকের জন্যই বড় বিপদ ও কষ্টের কারণ হয়ে থাকে। তবে যখন সে হিংসা প্রকাশ করতে শুরু করে, তখনই তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তাই আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে আমাদের একটি দোয়া শিখিয়েছেন, ‘আমি আশ্রয় চাই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা প্রকাশ করে।’ (সুরা ফালাক, আয়াত:৫)
এই আয়াতে এটি বলা হয়নি যে, ‘হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই’; বরং বলা হয়েছে, ‘যখন সে হিংসা করে তখন তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাই।’ কারণ, অন্তরের হিংসা কোনও ক্ষতি করে না; ক্ষতি করে তখনই যখন তা প্রকাশ পায়।
সর্বশেষ নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) পূর্বেই জানিয়ে দিয়েছেন, এই উম্মতের একটা অংশ হিংসা ও বিদ্বেষের রোগে আক্রান্ত হবে। এ প্রসঙ্গে হজরত জুবায়ের ইবনু আওয়াম (রা.) এর বর্ণনা করা হাদিসে তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে পূর্বেকার জাতিগুলোর নানা রোগ ঢুকে পড়বে, যার একটি হলো হিংসা ও বিদ্বেষ। এগুলো নরসুন্দরের মতো সব কিছু কেটে দেয়, তবে চুল নয়; বরং দ্বীনদারিতা কেটে নিঃশেষ করে দেয়। ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা ঈমান না আনা পর্যন্ত জান্নাতে যাবে না, আর পরস্পরকে ভালোবাসা না পর্যন্ত তোমাদের ঈমান সম্পূর্ণ হবে না। আমি কি তোমাদের এমন কিছু বলবো; যা করলে পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি হবে? তোমরা পরস্পরকে সালাম দাও।’ (জামে তিরমিজি)
রাসুলুল্লাহ (সা.) হিংসার এই ধ্বংসাত্মক দিকগুলোর প্রতি সতর্ক করে দিয়ে আরও বলেছন, ‘দুটি ক্ষুধার্ত নেকড়ে অতটা ক্ষতি করতে পারে না, সম্পদের লোভ এবং হিংসা একজন মুসলমানের দ্বীনদারিতার যতটা ক্ষতি করে। হিংসা নেক আমল ও পুণ্যগুলোকে এমনভাবে নষ্ট করে দেয়, যেমন আগুন কাঠকে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়।’ এই কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) হিংসা থেকে বাঁচতে বিশেষভাবে তাগিদ দিয়েছেন।
হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, হিংসা করো না, গিবত করো না। আল্লাহর বান্দা হয়ে সবাই ভাই ভাই হয়ে থাকো এবং কোনও মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে, সে তিন দিনের বেশি তার মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে।’ (বুখারি শরিফ)
মানুষের স্বভাব হলো, অন্যদের চেয়ে নিজেকে বড় ও এগিয়ে দেখতে চাওয়া। যখন কারও অবস্থা নিজের চেয়ে ভালো দেখায়, তখন তা সহ্য হয় না। ফলে সে চায়, তার সেই নেয়ামত নষ্ট হয়ে যাক, যেন দুজন সমান হয়ে যায়। এটাই হিংসার মূল কারণ।
আর হিংসা সাধারণত সমপদ ও সমমর্যাদার মানুষের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। যেমন- একজন ব্যবসায়ী আরেক ব্যবসায়ীর প্রতি হিংসা করবে, ছাত্র ছাত্রের প্রতি, লেখক লেখকের প্রতি হিংসা করবে। আর হিংসার মূল কারণ হলো, এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা। এর আরও অনেক কারণ আছে। ঈমানের দুর্বলতাও হিংসার একটি বড় কারণ।
হিংসা কোনও একক রোগ নয়; বরং অনেকগুলো আত্মিক ও অন্তরগত রোগ মিলেই হিংসার রূপ ধারণ করে। তাই হিংসার ক্ষতিও অনেক বেশি। এটি আমাদের দ্বীন, দুনিয়া, আখিরাত, ব্যক্তিত্ব ও সমাজ সবকিছুর ওপর খুব খারাপ ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আল্লাহ আমাদের অন্তরে মানুষের প্রতি হিংসার বদলে উত্তমের প্রতি ঈর্ষা (ইতিবাচক অনুপ্রেরণা) জাগিয়ে দিন। (আমিন)
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষক