জিহাদুল ইসলাম (জিহাদ)স্টাফ রিপোর্টার
প্রারম্ভ:প্রত্যেক জাতিরই বিজয় আছে,আমাদের মুসলমানেরও আছে, কিন্তু মুসলমানের বিজয় নানা দিক থেকে আলাদা। চিন্তা ও মূল্যায়ন,লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য,কর্ম ও কর্মপন্থা সব দিক থেকেই মুসলমানের বিজয় ভিন্ন মাত্রার, ভিন্ন প্রকারের।
জাতীয় বিজয় দিবস আমাদের দ্বারপ্রান্তে। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিজয় দিবস। নিজ নিজ ভূখণ্ড ও মাতৃভূমিকে ভালোবাসা মুসলিম সমাজের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মাতৃভূমিকে ভালোবাসা আমাদের প্রিয় নবীজীর (সা.) উত্তম আদর্শ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) কঠিন সময়ে যখন নিজ মাতৃভূমি মক্কা নগরী ত্যাগ করে মদিনার উদ্দেশে হিজরত শুরু করেছিলেন,তখন মাতৃভূমি মক্কার জন্য তাঁর চোখ থেকে অশ্রুর বয়ে যাচ্ছিল এবং মনে মনে মক্কার উদ্দেশে বলেছিলেন, হে মক্কা!আমি তোমাকে ভালোবাসি। কাফেররা নির্যাতন করে যদি আমাকে বের করে না দিত, কখনো আমি তোমাকে ত্যাগ করতাম না। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, ৪০৪ পৃষ্ঠা)
সুতরাং দেশের বিজয় দিবস আমাদের গৌরব,অহংকার।
আমাদের লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশে বিজয় অর্জিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বছর ঘুরে যখন ১৬ ডিসেম্বর ও স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ আসবে,তখন সে দিনগুলোতে কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে আমাদের অনেক করণীয় আছে।
★কোরআনের আলোকে বিজয় দিবস উদযাপন…
বিজয় সম্পর্কে কুরআনের দু’টি সুরা আমাদের সামনে রয়েছে।একটি সুরাহ ফাতহ (বিজয়) এবং অপরটি সুরাহ নাসর (সাহায্য)।
কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
اِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِیْنًا
অনুবাদ:নিশ্চয়ই আমি তোমাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট বিজয়…।
(সূরা ফাতহ)
দেশপ্রেম,দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রহরা ও বিজয় দিবসে তাসবিহ,ক্ষমাপ্রার্থনা এবং আনন্দ উৎসবও দেশের প্রতিটি নাগরিকের আবশ্যকীয় কাজ। এ বিজয় দিবসে দেশের জন্য আত্মদানকারী সব শহিদের জন্য দোয়া করা ইমানের একান্ত দাবি। যেমনটি আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-
اِذَا جَآءَ نَصۡرُ اللّٰهِ وَ الۡفَتۡحُ
অনুবাদ:যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে।
وَ رَاَیۡتَ النَّاسَ یَدۡخُلُوۡنَ فِیۡ دِیۡنِ اللّٰهِ اَفۡوَاجًا
অনুবাদ: আর আপনি দেখবেন মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে (জীবন ব্যবস্থা ইসলামে) প্রবেশ করছে।
فَسَبِّحۡ بِحَمۡدِ رَبِّکَ وَ اسۡتَغۡفِرۡهُ اِنَّهٗ کَانَ تَوَّابًا
অনুবাদ:সুতরাং আপনি আপনার প্রভুর প্রশংসা পবিত্রতা পাঠ করুন এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন; নিশ্চয়ই তিনি তাওবা কবুলকারী’। (সূরা:নাসর)
★সূরাটির মূল বক্তব্য…
যেকোনো বিজয়ের জন্য আল্লাহর সাহায্যের বিকল্প নেই। সে কারণেই মানুষকে অনন্ত কালের জন্য এ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে,যেকোনো বিজয় বা সফলতার জন্য আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে। তবে তিনি দান করবেন বিজয় বা সফলতা। আর সাহায্য চাইতে হবে,আল্লাহ প্রশংসা,পবিত্রতা ঘোষণা এবং তাওবাহ-ইসতেগফারের মাধ্যমে।যা বাস্তবায়িত হয়েছে প্রিয় নবী রাসূলু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে। (সূরা:নসর)
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তিনটি কর্মসূচি এই সূরায় ঘোষণা করেছেন…
সেগুলো হলো- ১. ফাসাব্বিহ (আল্লাহর তাসবিহ পাঠ তথা পবিত্রতা বর্ণনা করা)। ২. বিহামদি রব্বিক (আল্লাহর হাম্দ তথা শুকরিয় আদায় করা)। ৩. ওয়াসতাগফির (যুদ্ধের সময় ভুলভ্রান্তি তথা সীমালঙ্ঘন থেকে রবের কাছে ক্ষমা চাওয়া)।
সুতরাং,বিজয় দিবসে মহান আল্লাহর প্রশংসা এবং দেশের জন্য আত্মদানকারী সব শহিদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব। মুসলিম উম্মাহর উচিৎ ইসলামি সংস্কৃতি অনুসরণের মাধ্যমে বিজয় দিবস উদযাপন করা।
★হাদিসের আলোকে বিজয় দিবস উদযাপন…
আমাদের আদর্শ ইতিহাস আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীনের ইতিহাস। সেই ইতিহাস থেকে শুধু ফাত্হে মক্কার অধ্যায়টিই দেখুন। পুরো বিবরণ তো হাদীস ও সীরাত গ্রন্থে রয়েছে। এখানে শুধু হিরে-জহরতের মতো কিছু টুকরো ঘটনা তুলে ধরছি,
নবম হিজরীর মাহে রমযানে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মক্কা-অভিমুখে রওনা হলেন। কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ইতিমধ্যে ইসলাম কবুল করেছেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মুসলিম বাহিনীর যাত্রাপথে দাঁড় করিয়ে দিলেন,যেন ইসলামের শান-শওকত তাঁর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে।
একের পর এক গোত্র অতিক্রম করে যাচ্ছে, আনসারীদের দলটি যখন অতিক্রম করছিল,যার পতাকা ছিল বিখ্যাত আনসারী সাহাবী সা‘দ ইবনে উবাদা রা.-এর হাতে,কুরাইশের নেতা আবু সুফিয়ানকে দেখে তিনি বলে উঠলেন,
“اليوم يوم الملحمة”
“আজ রক্তপাতের দিন।”
আবু সুফিয়ান রা. ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লামের কাছে প্রশ্ন করলে তিনি সা‘দ ইবনে উবাদা রা.-কে নিষেধ করলেন এবং বললেন,
“اليوم يوم المرحمة”
“আজ দয়া ও করুণার দিন।”
অন্য জাতির বিজয়-দিবস সাধারণত হয়ে থাকে ‘ইয়াওমুল মালহামাহ’ রক্তপাত দিবস আর মুসলিম জাতির বিজয়-দিবস হচ্ছে, ‘ইয়াওমুল মারহামাহ’ দয়া ও করুণার দিবস।
এই ক্ষমা ও করুণার ঘোষণাই তো আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছিলেন কাবার দরজায় দাঁড়িয়ে,
“لا تثريب عليكم اليوم اذهبوا فأنتم الطلقاء
আজ তোমাদের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। যাও, তোমরা মুক্ত।
★বিজয় দিবস উদযাপনে প্রিয় নবী (সা.) এর একটি যুগোপযোগী হাদিস তুলে ধরা হলো…
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে এক দিন ও এক রাত (দেশের) সীমানা পাহারা দেওয়া এক মাসব্যাপী রোজা পালন ও মাসব্যাপী রাত জাগরণ করে নামাজ আদায়ের চেয়ে বেশি কল্যাণকর।এই অবস্থায় যদি ঐ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে;তবে যে কাজ সে করে যাচ্ছিল,মৃত্যুর পরেও তা তার জন্য অব্যাহত থাকবে। তার রিজিক অব্যাহত থাকবে,কবর ও হাসরে ঐ ব্যক্তি ফেতনা থেকে মুক্ত থাকবে’। (সহিহ মুসলিম)
হাদিস শরিফে রয়েছে,নবীজি (সা.) মদিনা নগরীকে খুব ভালোবাসতেন। কোনো সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকালে মদিনার সীমান্তে উহুদ পাহাড় চোখে পড়লে নবীজির চেহারাতে আনন্দের আভা ফুটে উঠত এবং তিনি বলতেন, এই উহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে এবং আমরাও উহুদ পাহাড়কে ভালোবাসি। (সহিহ বোখারি, ২য় খণ্ড, ৫৩৯ পৃষ্ঠা/ সহিহ মুসলিম, ২য় খণ্ড, ৯৯৩ পৃষ্ঠা)
★বিজয় দিবসে মুমিনগণের করনীয় কাজ সমূহ…
(১)শুকরিয়া ও তাসবীহ: আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা, ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ইত্যাদি পাঠ করা।
ইস্তিগফার ও
(২)দোয়া: অতীতের ভুলত্রুটির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং দেশের ও উম্মতের কল্যাণ কামনা করা।
(৩)সালাত ও কোরআন তেলাওয়াত: সালাতুল ফাতহ (বিজয় নামাজ) আদায় করা এবং কোরআন তিলাওয়াত করা।
(৪)শহীদদের জন্য মাগফিরাত: শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা।
(৫)সামাজিক ও মানবিক কাজ: গরিব,দুঃখী ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যা ইসলামের শিক্ষা।
★বিজয় দিবসে মুমিনগণের বর্জনীয় কাজ সমূহ…
(১)শিরক ও বিদআত: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে উৎসর্গ করা, কবর পূজা, ভাগ্য গণনা, জাদু, রাশিফল, বা কোন বস্তু বা ব্যক্তির উপর ভরসা করা।
(২)গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র: বিজয় দিবসের নামে বা অন্য কোনো উপলক্ষে গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বর্জনীয়।
(৩)অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা: নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, বেপর্দা হওয়া, অশোভন আচরণ, যা ইসলাম সমর্থন করে না।
(৪)অতিরিক্ত প্রদর্শন ও লোকদেখানো: লোক দেখানোর জন্য বা প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করা, যা ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য নয়।
(৫)মদ্যপান ও মাদকদ্রব্য সেবন: যেকোনো নেশাদ্রব্য সেবন করা।
(৬)অনর্থক ও অপচয়: বিজয় উদযাপনের নামে অতিরিক্ত খরচ করা এবং অপচয় করা।
(৭)অজুহাত ও গীবত: বিজয় উপলক্ষে একে অপরকে দোষারোপ করা, গীবত ও পরচর্চা করা।
★পরিশেষে বলবো…
বিজয় দিবসে মহান আল্লাহর প্রশংসা এবং দেশের জন্য আত্মদানকারী সব শহিদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা আমাদের ইমানি দায়িত্ব। মুসলমানদের উচিৎ ইসলামি সংস্কৃতি অনুসরণের মাধ্যমে বিজয় দিবস উদযাপন করা।
বিজয় দিবসে সব শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনার পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় একাত্মতা প্রকাশ করে দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত থাকাই হোক প্রতিটি নাগরিকের দৃপ্ত শপথ।
লেখক ও গবেষক মাওলানা শেখ মিলাদ হোসাইন সিদ্দিকী হাফিজাহুল্লাহ