১৬ ডিসেম্বর সারা দেশে পালিত হলো বিজয় দিবস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে তরুণরা কতটুকু জানেন, দিবসটিকে তারা কিভাবে মূল্যায়ন করছেন—এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার
ছবি : সংগৃহীত
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ও জাকসুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান শাকিব বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর কোনো একক রাজনৈতিক দলের নয়। এটি বাঙালি জাতির অহংকার। খুব খারাপ লাগে, যখন এই শহীদের সংখ্যা, বীরাঙ্গনাদের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রায়হান উদ্দীন বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে—অন্যায়ের কাছে মাথানত না করতে।
এই বিজয় আমাদের দিয়েছে নিজস্ব পরিচয়, নিজস্ব মানচিত্র ও স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার।’
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বিবিএর শিক্ষার্থী সামিন ইয়াসার বলেন, ‘আমরা এখনো প্রকৃত স্বাধীনতা উপলব্ধির অপেক্ষায় আছি। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ভার যাঁদের কাঁধে পড়বে তাঁদের কাছে প্রত্যাশা—তাঁরা যেন এই অর্জিত বিজয় আগলে রাখেন। তাহলেই দেশের জনগণ বিজয়ের প্রকৃত স্বাদ উপলব্ধি করতে পারবে।
’
মালয়েশিয়ার মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটির (এমএমইউ) শিক্ষার্থী মো. সজিব বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে আগ্রহ, গবেষণা ও শ্রদ্ধাবোধ। অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশকে দেখছেন সংগ্রামী ও দৃঢ়চেতা একটি জাতি হিসেবে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার প্রতি অগাধ ভালোবাসাই বাংলাদেশের বিজয়ের মূল ভিত্তি।’
রাশিয়ার এনআই লোবাচেভস্কি ন্যাশনাল রিসার্চ নিঝনি নভগোরোদ স্টেট ইউনিভার্সিটির (ইউএনএন) শিক্ষার্থী রবিন সূত্রধর বলেন, ‘বিদেশে বসবাস করার কারণে আমি আমার দেশের ইতিহাসকে আরো বিস্তৃত ও বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পাই।
এই দূরত্ব প্রায়ই আমার দেশপ্রেমকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের ছাত্র হিসেবে আমি এখন আরো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি, এ ধরনের সংগ্রাম বিশ্বের ইতিহাসে খুবই বিরল। আমি মনে করি বিজয় দিবস দায়িত্বের বার্তাও বহন করে। শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’
মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী তৌফিকুল ইসলাম আশিক বলেন, ‘ছোটবেলায় ১৬ ডিসেম্বর মানেই ছিল অন্য রকম স্মৃতি।
তরুণ বয়সে এসে এখন বিজয় দিবসে দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। একাত্তরের বিজয় দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি, কিন্তু চব্বিশের ছাত্র-জনতার বিজয় স্বচক্ষে দেখেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজয় দিবসের আয়োজন দেখলে মনে হয়, এটা শুধু পতাকা উত্তোলনের আনুষ্ঠানিকতা আর ছুটির দিনেই সীমাবদ্ধ। বিজয়ের সঙ্গে দেশ গড়ার যে প্রত্যয় জড়িয়ে আছে, তা যেন হতাশায় বিলীন না হয়। তরুণদের যেন কারো গোলামি করতে না হয়। চোখ-কান খোলা রেখে তাঁরা যেন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন—এটাই প্রত্যাশা।’
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল সিফাত বলেন, ‘একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য লালন করা আমাদের একান্ত জরুরি। আমাদের এক গৌরবময় অধ্যায় এই মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের পূর্বপুরুষের এই যে সংগ্রাম, ত্যাগ তা ভুলে যাওয়া প্রতারণার শামিল। মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখেছিলেন একটা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। কথায় আছে স্বাধীনতা অর্জন থেকে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। দেশের সংকটময় মুহূর্তে এই স্বাধীনতা রক্ষায় তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের উচিত মুক্তিযুদ্ধের আসল ইতিহাস জানা।’
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ব্ল্যাক সি ইউনিভার্সিটি জর্জিয়ার শিক্ষার্থী আদিত্য রায়হান চৌধুরি বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাঙালি প্রমাণ করেছে, অধিকার ছিনিয়ে আনতে হলে ঐক্যই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এই বিজয় আজও আমাদের পথচলার প্রেরণা।’
স্পেনের ইউনিভার্সিতাত আউতোনোমা দে বার্সেলোনা (ইউএবি)-এর শিক্ষার্থী তন্ময় হালদার বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫২ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের নারীদের অগ্রগতির চিত্র এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। বিশেষ করে দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ তুলনামূলকভাবে এখনো সীমাবদ্ধ। দেশের বহু এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, তথ্য-প্রযুক্তি শিক্ষা বা আধুনিক উদ্যোক্তা সহায়তা কার্যক্রম গড়ে ওঠেনি। ফলে আগ্রহ ও সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাহীনতা নারীদের ঘরের বাইরে গিয়ে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণে সবচেয়ে বড় বাধা। যাতায়াতের সমস্যা ও সামাজিক চাপ নারীদের স্বপ্নকে থামিয়ে দেয়।’
কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন বলেন, ‘বিজয়ের এত বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন প্রজন্মকে আজও ভাবতে হয় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কতটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে সীমান্তবর্তী অনেক অঞ্চল এখনো নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়। মাঝে মাঝে দেশের নৌবন্দর বা জলসীমা ঘিরে বিদেশি আগ্রহ এবং চাপের আলোচনা উঠে আসে, যা আমাদের সতর্ক করে দেয়। তবুও এ দেশের ইতিহাস সাক্ষী, যখনই মাতৃভূমির প্রশ্ন এসেছে, তখনই ছাত্রসমাজ সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। আমাদের দাবি, এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’
চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রনি চৌধুরী বলেন, ‘এই প্রজন্ম জন্মসূত্রে স্বাধীন, কিন্তু তাঁরা স্বাধীনতার মানে বোঝেন দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, একটি সত্যিকার স্বাধীন দেশ গড়তে হলে সমাজে ন্যায্যতা, সমান সুযোগ ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীনতা শুধু একটি অর্জন নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া—যা পরিপূর্ণতা পায় দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব ও সুশাসনের মাধ্যমে।’
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী নুর নাহার মিম বলেন, ‘সমতার মূল্যবোধ, বৈষম্যহীন সমাজ, ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নকে স্বাধীনতার ধারাবাহিক অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ, বেকারত্ব, মেধাপাচার এবং পরিবেশ সংকট নিয়ে অনেকের মতো আমিও উদ্বিগ্ন। দেশ এখন রূপান্তরের মোড়ে; সঠিক দিকনির্দেশনা ও সুশাসন থাকলে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যেতে পারবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের শিক্ষার্থী মারিয়াম সুলতানা রিমা বলেন, ‘রক্ত, ত্যাগ আর অদম্য সাহসে রচিত হয়েছিল স্বাধীনতার মহাকাব্য। শহীদদের আত্মদান আমাদের প্রেরণা। এই বিজয় আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের স্বাধীন চেতনার চিরন্তন উৎস।’
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকহ্ অ্যান্ড ল বিভাগের শিক্ষার্থী ইরফান উল্লাহ্ বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের দিন। ত্যাগ ও স্বাধীনতার স্মারক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থান এই বিজয়ের চেতনাকে নতুন করে স্মরণ করিয়েছে। ন্যায়, অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার সংগ্রাম এখনো চলমান। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো ইতিহাস থেকে শক্তি নিয়ে বর্তমানের অন্যায় মোকাবেলা করা—সত্যের পক্ষে থাকা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়া।’
ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী উম্মে মাহবুবা ইমা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়, বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি এক অবিরাম অনুপ্রেরণা। ১৯৭১ সালে তরুণরাই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও তাঁদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে তরুণরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। যখনই কেউ অধিকারের ওপর আঘাত এনেছে, তখনই তরুণরা রাজপথে নেমেছেন। তাঁদের সাহস, মেধা, সামাজিক সক্রিয়তা ও উদ্ভাবনী শক্তি সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য যথেষ্ট।’
ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থী মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘বিজয়ের ৫৫ বছর পরেও কি সত্যিকারের স্বাধীনতা আমরা খুঁজে পেয়েছি, প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারি, স্বাধীন বাংলাদেশ পেলেও এখানকার মানুষের স্বাধীনতা নেই। স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশে দুর্ভিক্ষের কারণে অনাহারে অনেক মানুষ মারা যায়। আজ নানাভাবে আমরা স্বাধীনতাবঞ্চিত!’
খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এম তাওহিদ হোসেন বলেন, ‘গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের বিখ্যাত একটি উক্তি আছে—মানুষ মাত্রই রাজনৈতিক জীব। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবটা আরো বেশি, তবে আমরা কি স্থিতিশীল এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি স্বাধীনতার ৫৪ বছরে তৈরি করতে পেরেছি? উত্তর হচ্ছে—না। গত ৫৪ বছরে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন সাধিত হলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সৌহার্দ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবেশ আমরা গড়ে তুলতে পারিনি।’