ইকবাল হোসেন ইমন
ফাইল ছবি
মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সৌন্দর্যপ্রেমী। বেশভূষায় পরিপাটি হয়ে চলা মানুষের সাধারণ প্রবৃত্তি। তা ছাড়া পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি, শালীন পোশাক পরিহিত মানুষকে সবাই পছন্দ করে। ইসলাম বাহ্যিক বেশভূষায় পরিপাটি হয়ে চলাকে উৎসাহিত করেছে। রাসূল (সা.) প্রায়ই বলতেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সুন্দর। তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন।’ (সহি মুসলিম, হাদিস : ১৬৬)। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা সালাতের সময় সাজসজ্জা গ্রহণের জন্য সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদ গ্রহণ করো।’ (সূরা আরাফ, আয়াত : ৩১)।
রাসূল (সা.) বাহ্যিক বেশভূষা ও চালচলনে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তিনি সাহাবিদেরও পরিপাটি হয়ে চলতে নির্দেশ দিতেন। আবুল আহওয়াস (রহ.) থেকে তার পিতা সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন-একদা আমি কমদামি পোশাক পরে নবী (সা.)-এর কাছে এলে তিনি বললেন, তোমার কেমন ধনসম্পদ আছে? আমি বললাম, আল্লাহ আমাকে উট, ছাগল, ঘোড়া ও দাস-দাসী ইত্যাদি সম্পদ দিয়েছেন। তিনি (সা.) বলেন, যেহেতু আল্লাহ তোমাকে সম্পদশালী করেছেন, কাজেই আল্লাহর নেয়ামত ও অনুগ্রহের নিদর্শন তোমার মাঝে প্রকাশিত হওয়া উচিত। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৬৩)।
ইসলাম অপরিচ্ছন্ন ও জীর্ণ-শীর্ণ পোশাক পছন্দ করে না। রাসূল (সা.) নতুন পোশাক পরিধানের জন্যও উৎসাহিত করেছেন। কারণ, নতুন পোশাক পরিচ্ছন্নতা ও আল্লাহর নেয়ামতের প্রকাশ ঘটায়। রাসূল (সা.) ওমর (রা.)-এর পরনে একটি সাদা জামা দেখতে পেয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার এ কাপড় ধোয়া না নতুন?’ তিনি বলেন, ‘না, বরং ধৌত করা।’ এবার রাসূল (সা.) বলেন, ‘নতুন কাপড় পরিধান করো, উত্তম জীবনযাপন করো এবং শহীদি মৃত্যুবরণ করো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৫৫৮)।
বাহ্যিক পরিপাটির ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) ছিলেন অহংকারহীন, মার্জিত, তবে রুচিশীল। তাঁর জীবন ছিল পরিমিতি, পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যের জীবন্ত উদাহরণ। মহানবী (সা.) যেমন পরিপাটি ছিলেন-
পছন্দের পোশাক
মহানবী (সা.) ইয়ামানে প্রস্তুত করা লুঙ্গি এবং চাদর পরিধান করতেন। তাঁর দুই ঈদ ও জুমার দিন পরিধানের জন্য সুন্দর একজোড়া কাপড় ছিল। আবার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ছিল আরেক জোড়া। একদা আনাস (রা.)কে রাসূল (সা.)-এর প্রিয় ও আকর্ষণীয় পোশাক কী ছিল জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, রাসূল (সা.)-এর কাছে প্রিয় পোশাক ছিল হিবারাহ্ নামক ইয়ামানি চাদর। (সহি মুসলিম, হাদিস : ৫৩৩৩)।
আয়েশা (রা.) ও আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) উভয়ে বলেন, ‘রাসূল (সা.) যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তখন তিনি তাঁর কারুকার্যপূর্ণ চাদর দ্বারা মুখ ঢেকে রাখেন। যখন তাঁর শ্বাসরোধ হয়ে আসত, তখন তাঁর মুখ থেকে তা সরিয়ে নিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৮১৫)।
জামার বোতাম খুলে রাখা
কুররাহ বিন ইয়াস (রা.) বলেন, ‘আমি রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে তাঁর হাতে বাইয়াত হলাম। তাঁর জামার বোতামগুলো খোলা ছিল।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৫৭৮)।
সুগন্ধি ব্যবহার
রাসূল (সা.) সুগন্ধি ব্যবহারে অনেক যত্নবান ছিলেন। তাকে কেউ সুগন্ধি উপহার দিলে কখনোই তা তিনি ফিরিয়ে দিতেন না। যেমন আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.)-এর কাছে সুগন্ধি পেশ করা হলে, তিনি তা ফেরত দিতেন না।’ (নাসায়ী, হাদিস : ৫২৫৮)।
চোখে সুরমা দেওয়া
রাসূল (সা.) চোখে সুরমা ব্যবহার পছন্দ করতেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সা.) বলেছেন, তোমরা ইছমিদ সুরমা ব্যবহার করো। কারণ, তা চোখের জ্যোতি বৃদ্ধি করে ও পরিষ্কার রাখে এবং অধিক ভ্রু উৎপন্ন করে। ইবনে আব্বাস (রা.) আরও বলেন, নবী (সা.)-এর একটি সুরমাদানি ছিল। প্রত্যেক রাতে (ঘুমানোর আগে) ডান চোখে তিনবার এবং বাম চোখে তিনবার সুরমা লাগাতেন। (শামায়েলে তিরমিযি, হাদিস : ৪১)।
পরিপাটি চুল
রাসূল (সা.) চুল আঁচড়িয়ে পরিপাটি করে রাখতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি হায়েজ (ঋতুবতী) অবস্থায়ও রাসূল (সা.)-এর মাথার চুল পরিপাটি করতাম। (শামায়েলে তিরমিযি, হাদিস : ২৭)।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, একদা রাসূল (সা.) আমাদের এখানে এসে এক এলোমেলো চুলওয়ালাকে দেখে বললেন, ‘লোকটি কি তার চুলগুলো আঁচড়ানোর জন্য কিছু পায় না?’ তিনি ময়লা কাপড় পরিহিত অপর ব্যক্তিকে দেখে বলেন, ‘লোকটি কি তার কাপড় ধোয়ার জন্য কিছু পায় না?’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৬২)।
চুল ও দাড়িতে রং লাগানো
উসমান বিন মাওহাব (রহ.) বলেন, আমি উম্মে সালামা (রা.)-এর কাছে প্রবেশ করলাম। তিনি আমার সামনে রাসূল (সা.)-এর চুল বের করলেন; যা মেহেদী ও কাতাম দ্বারা রঞ্জিত ছিল। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬২৩)।
এ ছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘আমি রাসূল (সা.)কে এরূপ (দাড়িতে সোনালি রং) করতে দেখেছি।’ (নাসায়ী, হাদিস : ৫২৪৩)।
আংটি ব্যবহার
রাসূল (সা.) হাতে রৌপ্যের আংটি ব্যবহার করতেন। ইসলামে পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার নিষিদ্ধ। আবু সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর ডান হাতে আংটি পরতেন। (নাসায়ী, হাদিস : ৫২০৩)।
আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূল (সা.) একটি রুপার আংটি গ্রহণ করেন। তাতে আবিসিনীয় পাথর ছিল এবং তার গায়ে ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ খোদাইকৃত ছিল।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬৪১)।
ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কে সাধ্যের মধ্যে পরিপাটি ও শালীন পোশাক পরিধান করতে উৎসাহিত করেছে; তবে এর মাধ্যমে অহংকার, অশ্লীলতা বা অপচয় করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।