অদিতি করিম
অদিতি করিম
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। কয়েক দিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা চলছে। দুই দিনের ব্যবধানে দুই দেশের হাইকমিশনারকে তলবের ঘটনা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টির আবহ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
গত রবিবার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেভাবে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করেছিল, দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর ক্ষেত্রে সেভাবে ঘটেনি।
প্রণয় ভার্মাকে আগের দিন তলবের বিষয়টি অবহিত করা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার সকালে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ফোন করে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে রিয়াজ হামিদুল্লাহকে দিল্লির জওহরলাল নেহরু ভবনে অবস্থিত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়। ১৬ মাস ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে টানাপড়েন অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক দিনে বিশেষ করে ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর সেই সম্পর্কে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।
তফসিল ঘোষণার পর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচনের বিপক্ষে বক্তব্য-বিবৃতি প্রচার করা হয়। অন্যদিকে তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সমর্থক ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। গতকাল রাতে তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাকে হত্যার চেষ্টাকারীরা ভারতে পালিয়ে গেছে বলে আলোচনা আছে।
এ পরিস্থিতিতে ১৪ ডিসেম্বর ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাকে বলা হয়, ভারতে পালিয়ে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের দ্রুত অবসান চায় ঢাকা। হাদিকে হত্যাচেষ্টায় জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা ভারতে প্রবেশ করলে তাদের গ্রেপ্তার করে ফেরত পাঠানোরও আহ্বান জানায় ঢাকা।
ওই তলবের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপে ভারতের ভূখণ্ড কখনোই ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে ভারতের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হচ্ছে।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা নিশ্চিতকরণসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে-বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে ভারত তা প্রত্যাশা করে।
গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক কি নতুন এক পর্বে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই একটা গুড টু ওয়ার্কিং রিলেশন চাই বলে আসছি। আমরা চাইলেই সেটা হবে, এমন তো কোনো কথা নেই! দুই পক্ষ থেকেই তো সম্পর্কটাকে এগোনোর জন্য চেষ্টা করতে হবে। আমার মনে হয় আমরা দুই পক্ষ মিলে হয়তো ততটা এগোতে পারিনি। যে কারণে টানাপড়েন রয়ে গেছে।’ তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘সর্বশেষ যে বক্তব্য (ভারতের) এসেছে, তাতে আমাদের নসিহত করা হয়েছে। সেটার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশে নির্বাচন কেমন হবে, এটা নিয়ে আমরা প্রতিবেশীদের উপদেশ চাই না।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার স্পষ্টভাবে বলে আসছে, ‘অত্যন্ত উঁচু মানের’ নির্বাচন করতে চায়। মানুষ যেন ভোট দিতে যায়, এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়। এমন পরিবেশ গত ১৫ বছর ছিল না।”
ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী। বাংলাদেশ এবং ভারত একটি ৪,১৫৬.৫৬ কিলোমিটার (২,৫৮২ মাইল) দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমানা ভাগাভাগি করে, এটা বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম ভূমি সীমানা। দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আছে বন্ধুত্ব এবং টানাপড়েন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক সবচেয়ে শীতল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই সম্পর্কের অবনতি কারও জন্যই ভালো না। বর্তমান পরিস্থিতি দুই দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পারস্পরিক নির্ভরশীল। বাংলাদেশকে যেমন অনেক বিষয়ে ভারতের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি ভারতও বাংলাদেশের ওপর নানাভাবে নির্ভরশীল। ভারতে অস্থিরতার প্রভাব যেমন বাংলাদেশে পড়ে তেমনি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার আঁচ ভারতেও লাগে। এ কারণেই দুই দেশের পারস্পরিক সম্মানজনক সম্পর্ক জরুরি। একটা কথা সব সময় মনে রাখতে হবে, সবকিছু পাল্টানো যায়, কিন্তু প্রতিবেশী বদল করা যায় না।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতা করে কোনো দেশ কাক্সিক্ষত উন্নতি করতে পারে না। আমরা যদি বিশ্বের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব, সেসব দেশ বিশ্বে সফল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে, তারা সবাই প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা, মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আবার অনেক সম্ভাবনাময় দেশ প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে না পারার কারণে নানা সমস্যায় জর্জরিত। রাশিয়া-ইউক্রেন তার সবশেষ প্রমাণ। তাই প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই। এটা বাংলাদেশের জন্য যেমন প্রযোজ্য তেমনই ভারতের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা অনস্বীকার্য। কিন্তু ভারতকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।
ভারত প্রায়ই তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে বড় ভাইসুলভ আচরণ করে। কোনো প্রতিবেশীর সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক ভালো না। এই উপমহাদেশে ভারত সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র। এ জন্যই তাদের মধ্যে সব সময় একটা আধিপত্যবাদী মনোভাব কাজ করে থাকে বলে অনেকে অভিযোগ করেন। ভারতের এই দাদাগিরির জন্যই প্রতিবেশীদের সঙ্গে টানাপোড়েন হয় বলে অনেকে মনে করেন। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের হস্তক্ষেপের অভিযোগও ওঠে। ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ থেকে ভারতকে অবশ্যই মুক্ত হতে হবে। কর্তৃত্ববাদী মনোভাব নয় বরং বন্ধুত্বের মাধ্যমে প্রতিবেশীদের মন জয় করতে হবে ভারতকে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত বাস্তবতা ভারতকে উপলব্ধি করতে হবে। এ দেশের মানুষের মনোভাব বুঝতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ভালো হবে না।
পাশাপাশি বাংলাদেশের সর্বমহলকে সংযত এবং দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলকথা হলো, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। সব ধরনের উসকানির বিরুদ্ধে আমাদের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যা অন্য রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে গণ্য হয়। প্রধান উপদেষ্টা সব সময় বলেন, বাংলাদেশ শান্তির পক্ষে। সহিংসতার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড কখনোই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভয়ারণ্য নয়।
আমরা আমাদের সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কারও কাছে মাথা নত করে না।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।