মিজানুর রহমান বাবুল সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
দেশের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থা আজ এক গভীর সংকটকাল অতিক্রম করছে। নৈরাজ্য, সহিংসতা ও অরাজকতার ছায়া ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে জনজীবনের ওপর। প্রশ্ন জাগে—এই নৈরাজ্যে লাভ কার? উত্তর খুব স্পষ্ট—লাভ হয় অন্ধকার শক্তির। যেকোনো ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে তৎপর হয়ে ওঠে।
নৈরাজ্যকারীরা তখনই নিরস্ত হয়, যখন রাষ্ট্র স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দেয়—জিরো টলারেন্স। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের কোনো স্থান নেই—এই ঘোষণা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করাই সরকারের দায়িত্ব। অন্যথায় দেশ পড়ে যায় গভীর বিপদের মুখে।
সম্প্রতি হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ উদ্বেগজনক। বিএনপি তাদের সংবাদ সম্মেলনে এই ঘটনাকে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং দুটি পত্রিকা অফিস, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এই নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। নিন্দা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু কেবল নিন্দা যথেষ্ট নয়। জনগণের মনে তখন সেই পুরোনো কথাটিই ভেসে ওঠে—
‘ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মরিয়া গেল।’
শাহবাগ থেকে আগত একটি উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালিয়েছে। সংখ্যায় তারা খুব বেশি না হলেও তাদের মারমুখী আচরণ সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিরোধ করা অসম্ভব করে তোলে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার মূল দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। অথচ দেখা গেছে, হামলার সময় প্রয়োজনীয় সংখ্যক বাহিনী সেখানে উপস্থিত ছিল না। ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার চেষ্টা করা হয়েছে, ফায়ার সার্ভিসও এসেছে প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—আগে কেন নয়?
রাজনৈতিক অঙ্গনে নিন্দা-প্রতিবাদ হচ্ছে, বিবৃতি আসছে। কিন্তু ঘাপটি মেরে থাকা অরাজক শক্তি যে সুযোগ নিচ্ছে, তা বন্ধে রাষ্ট্র কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়—সেটিই এখন দেখার বিষয়। যেকোনো ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে সহিংসতা চালানো স্বাধীনতা নয়, এটি নিখাদ অরাজকতা। এই সত্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে উপলব্ধি করতে হবে।
উত্তেজিত জনতা যুক্তি বোঝে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কারা তাদের উত্তেজিত করছে? কারা পর্দার আড়াল থেকে সুতো নাড়ছে? জাতীয় নির্বাচন সামনে। এই সময় নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা হলে তা কঠোর হাতে দমন করাই সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি মহল থেকে বারবার বলা হচ্ছে—যেকোনো মূল্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু শুধু নির্বাচন নয়, প্রয়োজন অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। তার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতেই হবে।
নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ছাড়া এই পরিবেশ তৈরি সম্ভব নয়। যারা ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারে’, তাদের ব্যাপারে উদাসীন হলে বিপদ আরও বাড়বে। বহুমত, বাক্স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির প্রবহমানতার ওপর আঘাত রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
দেশের মানুষ আজ ক্লান্ত, উদ্বিগ্ন ও নিরাপত্তাহীন। তারা সংঘাত নয়, শান্তি চায়। তারা ভাঙচুর নয়, স্থিতিশীলতা চায়। তারা ভয় নয়, বিশ্বাসের সঙ্গে আগামী দিনের পথে হাঁটতে চায়।
দেশের মানুষের শান্তি এখন খুব প্রয়োজন।