মিজানুর রহমান বাবুল,
সম্পাদক, সংবাদ এই সময়
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই নয়; ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তা, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং জনগণের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত করার ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। কিন্তু বিজয়ের ৫৪ বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত—এই রাষ্ট্র কি সত্যিই জনগণের?
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পূর্ববঙ্গে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করে যে দুঃসাহসিক ভূমিকা রেখেছিলেন, তা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। খালেদ মোশাররফের বিদ্রোহ, জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা, আবুল মঞ্জুর, আবু তাহের, এম এ জলিল, জিয়াউদ্দিন আহমদের মতো সেনা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আত্মত্যাগ—সব মিলিয়ে যুদ্ধটি ছিল বহুমাত্রিক ও সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এক জনযুদ্ধ।
কিন্তু যুদ্ধশেষে সেই সহযোদ্ধাদের অনেকেই হয়ে পড়লেন একে অপরের প্রতিপক্ষ। কেউ নির্মমভাবে নিহত হলেন, কেউ বিচারহীন হত্যার শিকার, কেউ কারাবন্দি, কেউ আবার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন। এ থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—রাষ্ট্র স্বাধীন হলেও রাষ্ট্রব্যবস্থা স্থিতিশীল ও গণমুখী হয়ে ওঠেনি।
স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—পুরোনো ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি শাসন কাঠামো ভেঙে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, পুরোনো আইন, আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা এমনকি সামরিক কাঠামোও প্রায় অবিকল রেখে দেওয়া হলো। পাকিস্তান ফেরত সেনা সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে নীরব বিভাজন তৈরি হলো। রক্ষীবাহিনী ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রীয় অস্থিরতাকে আরও গভীর করল।
সংবিধান প্রণীত হলেও সেখানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর স্বীকৃতি অনুপস্থিত রইল। বাংলাদেশকে একটি বহুজাতিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে জাতিরাষ্ট্রের সংকীর্ণ ধারণায় আটকে রাখা হলো—অনেকটা পাকিস্তানি আদলেই।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতরের দ্বন্দ্ব, তাজউদ্দীন আহমদের অপসারণ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সরকার ও জনগণের মাঝে দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। জরুরি অবস্থা, একদলীয় শাসন—এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় আসে জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়—১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি সরকার পতন নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিতে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। এর পরের অধ্যায়ে ক্যু, পাল্টা ক্যু, জেলহত্যা, সামরিক শাসন—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র আরও দূরে সরে যায় জনগণ থেকে।
এরশাদের সামরিক শাসন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা, ছদ্মবেশী গণতন্ত্র, ভোটারবিহীন নির্বাচন—সবকিছু পেরিয়ে আমরা আজও সেই একই প্রশ্নে দাঁড়িয়ে আছি। সংবিধানে লেখা আছে, ‘সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ’, কিন্তু বাস্তবে সেই ক্ষমতা জনগণের হাতে পৌঁছায়নি।
বিজয়ের ৫৪ বছর পরও সাধারণ মানুষ খোঁজে এক রহস্যাবৃত স্বাধীনতা—যেখানে ভোটের মর্যাদা থাকবে, বিচার হবে ন্যায়ভিত্তিক, রাষ্ট্র হবে জবাবদিহিমূলক এবং ক্ষমতার প্রকৃত মালিক হবে জনগণ।
রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে, সন্দেহ নেই।
কিন্তু রাষ্ট্রের মালিকানা—আজও অধরাই।