নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
শীতে রাজশাহীর পদ্মার চরে একসময় হাজার হাজার পরিযায়ী হাঁস, প্লোভার এবং জলচর পাখির আবাসস্থল ছিল। এখন সেই পরিযায়ী পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মার চরাঞ্চলে আবাসস্থল ধ্বংস, মানবিক বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি এবং শহরে অতিরিক্ত আলোক দূষণ এর প্রধান কারণ। স্থানীয় পাখি পর্যবেক্ষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, পদ্মা নদীর তীরে ডিসেম্বরের প্রথম দিকে পাখির সংখ্যা এক দশক আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের চারটি বিভাগে পরিচালিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা জরিপে দেখা যায়, দেশের মোট জল পাখির উপনিবেশের ৪০ শতাংশই রাজশাহীতে অবস্থিত। সমীক্ষায় সারা দেশে চিহ্নিত ৩৬৭টি উপনিবেশের মধ্যে ১৫৭টি পাওয়া গেছে রাজশাহীতে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে নদী ভূমির কাদামাটি অঞ্চল, জলাভূমি ও বাসা বাঁধার জন্য উপযোগী গাছ কমে যাওয়ায় এসব প্রজাতি এখন ঝুঁকির মুখে।
‘জনসংখ্যার অনুমান, প্রজাতির গঠন, উপনিবেশের বৈশিষ্ট্য, উত্তর ও উত্তর পূর্ব বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক জলাশয়ের স্থানিক বিবরণ’ শীর্ষক গবেষণা পত্রে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, পদ্মার জলাভূমির আবাসস্থলের ক্রমাগত অবক্ষয়, বিশেষ করে জলাভূমি, কাদামাটি ও বাসা বাঁধার গাছের ধ্বংস এখন এই প্রজাতিগুলোকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ পরিত্যক্ত প্রজনন স্থান সরাসরি আবাসস্থল ধ্বংস ও মানুষের বিশৃঙ্খলার কারণে হারিয়ে গেছে। যা এখন রাজশাহীর নদী দৃশ্যপটে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
এ বিষয়ে ১৪ বছর ধরে রাজশাহীর একজন পাখি পর্যবেক্ষক হাসনাত রনি বলেন, ২০১০ সাল থেকে পদ্মার চরে পাখির সংখ্যা আগের তুলনায় দশ ভাগের এক ভাগেরও কমে নেমে এসেছে।
যে পদ্মা নদী এলাকায় নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা যেত এখন ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসেও পাখি দেখা বিরল। তিনি আরও বলেন, রাতে রাজশাহী শহরের তীব্র আলোকসজ্জার কারণে পরিযায়ী পাখিদের ঐতিহ্যবাহী উড়ালপথ ব্যাহত হচ্ছে।
অনেক প্রজাতি যারা একসময় শহরের কাছাকাছি এসেছিল তারা এখন ভোর হওয়ার আগেই অন্যত্র চলে যায়। তারা রাজশাহীর কাছাকাছি আসে, কিন্তু আকাশ খুব উজ্জ্বল। তাদের সময় বিঘ্নিত হয় এবং তারা দূরে সরে যায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আমিনুজ্জামান মো. সালেহ রেজা বলেন, আলোক দূষণ নিশাচর প্রাণীদের ওপর হস্তক্ষেপ করছে। পরিযায়ী পাখিদের বিপথগামী করছে এবং পদ্মা নদীর তীরবর্তী এবং কাছাকাছি চরাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন করছে।
এ ছাড়া নভেম্বরের প্রথম দিকে অভূতপূর্ব বৃষ্টিপাতের কারণে পদ্মা নদীতে চরভূমির উত্থানে বিলম্বের কারণেও পরিযায়ী পাখিরা দেশের অন্য অংশে উড়ে যাচ্ছে। এক সময় জেলায় খাল-বিলসহ হাজার হাজার খোলা জলাশয় ছিল। প্রায় সবগুলোই এখন বাণিজ্যিক মাছের খামারে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে পরিযায়ী পাখি আর ওই পুকুরগুলোতে আশ্রয় নেয় না। রাজশাহী বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ সার্কেলের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির বলেন, এটি সত্য যে মানুষের বিশৃঙ্খলা ও সংকুচিত আবাসস্থল পরিযায়ী পাখির সংখ্যাকে প্রভাবিত করছে। কিন্তু যথাযথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া এই হ্রাসের মাত্রা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।