মিজানুর রহমান বাবুল সম্পাদক সংবাদ এই সময়।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অধ্যায়ের অবসান হলো মঙ্গলবার সকালে। বেগম খালেদা জিয়া চলে গেলেন, অনন্তের পথে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গণতন্ত্রের এক আপোসহীন নেত্রী, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার একজন সাহসী নির্মাতা, নিপীড়িত মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর— বেগম জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের ঐক্যের প্রতীক। একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক।
তিনি দেশনেত্রী। দলমত নির্বিশেষে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত একজন মহান ব্যক্তিত্ব।
তাঁর চলে যাওয়ায় এদেশের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। বাংলাদেশের মানুষ হারালো একজন বিশ্বস্ত অভিভাবক।
তরুণ প্রজন্ম হারালো একজন পথপ্রদর্শক। নারীরা হারালো তাদের প্রেরণা ও ভালোবাসার প্রিয় মানুষকে। নিপীড়িত মানুষ হারালো তাদের সংগ্রামের সাহসকে। এদেশের দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি চলে গেলেন।
সব মত ও পথের মানুষকে কাঁদিয়ে তিনি চিরবিদায় নিলেন। বাংলাদেশে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করে তিনি বিদায় নিলেন।
তবে আমি মনে করি, বেগম জিয়ার মৃত্যু নেই, তিনি অমর। ৩০ ডিসেম্বর শীতের সকালে তার দৈহিক প্রস্থান হয়েছে। তিনি সৃষ্টিকর্তার কাছে চলে গেছেন।
কিন্তু বেগম জিয়া বেঁচে থাকবেন তার কাজের মাধ্যমে, তার আদর্শের জন্য। বেগম জিয়ার আদর্শের মৃত্যু হবে না কোনোদিন। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন বেগম খালেদা জিয়া বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে।
তার কর্মজীবনে অনুপ্রাণিত হবে কোটি মানুষ। তার ত্যাগ স্মরণ করবে বাংলাদেশের জনগণ। প্রতিটি নারী, প্রতিটি শিশু তাকে সম্মান করবে, সবসময়। কারণ তিনি নারী ও শিশুদের জন্য একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করে গেছেন চিরকাল। বেগম জিয়ার সংগ্রামের ইতিহাস এদেশের মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে চিরকাল।
যেকোনো গণতন্ত্রের সংগ্রামে তিনিই হবেন আন্দোলনরত মানুষের অনুকরণীয়। আবারও যদি বাংলাদেশ স্বৈরশাসনের কবলে পড়ে, তাহলে সেখান থেকে মুক্তির পথে বেগম জিয়াই হবেন আলোর দিশারি। এদেশের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে থাকবেন তিনি অনন্তকাল। নির্যাতিত মানুষ তার কাছেই ফিরে যাবে সংগ্রামের দীক্ষা নিতে।
বেগম জিয়া তার জীবনে যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা থেকে শিক্ষা নেবে প্রতিটি মানুষ। বেগম জিয়ার জীবন ও দর্শন যেকোনো মানুষকে বিকশিত করবে, উৎসাহিত করবে।
বেগম জিয়ার ৮০ বছরের জীবনে কোনো অপূর্ণতা নেই। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বেগম জিয়া একজন আদর্শ সহধর্মিণী, যিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে উৎসর্গ করেছিলেন। নয় মাসের যুদ্ধে তিনি দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে অন্যরকম যুদ্ধ করেছেন। বিজয়ের পর নীরবে নিভৃতে তিনি তার প্রাণপ্রিয় স্বামীর পাশে থেকেছেন, সহযোগিতা করেছেন।
দেশের জন্য জিয়াউর রহমান শহীদ হলে বেগম জিয়া তার স্বামীর আদর্শকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আরও বেশি জনপ্রিয় করেছেন তিনি শহীদ জিয়ার আদর্শ। বেগম জিয়া একজন আদর্শ মা, যিনি তার দুই সন্তানকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। বেগম জিয়া একজন মানবিক মানুষ, যিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মানুষের কল্যাণে নিবেদিত ছিলেন।
বেগম জিয়া বাংলাদেশে নারী মুক্তির একজন পথপ্রদর্শক। যার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নারী শিক্ষা বিকশিত হয়েছে। তিনিই নারী শিক্ষা অবৈতনিক করেন। নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেন। বেগম জিয়া শিশু অধিকারের একজন মহান নেতা। তিনি শিশুদের জন্য শিক্ষা অবৈতনিক করেন। শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করেন।
বেগম জিয়া একজন জনদরদী কৃষকবান্ধব নেত্রী। তিনি কৃষকদের উন্নয়নে কাজ করেছেন। কৃষি ঋণ প্রবর্তন করেন। বাংলাদেশে শিল্পায়নে বেগম জিয়ার অবদান কেউ কোনোদিন অস্বীকার করতে পারবে না। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে তার পদক্ষেপ অনুসরণ করলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে।
বেগম জিয়া একজন সফল কূটনীতিক। বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সারাবিশ্বে তিনি সম্মানিত হয়েছেন, বাংলাদেশকে করেছেন সম্মানিত। কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব— এই নীতিতে তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
বেগম জিয়া একজন অনুকরণীয়, অসাধারণ রাজনীতিবিদ। আশির দশক থেকে এখন পর্যন্ত তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নেতা। তিনি বাংলাদেশে আদর্শবান রাজনীতিবিদদের জন্য উদাহরণ।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনো আদর্শের সঙ্গে আপোস করেননি। নিজের আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে তা বাস্তবায়নের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেছেন। বর্তমান প্রজন্মের জন্যই শুধু নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও তিনি প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।
আদর্শের লড়াইয়ে তিনি নির্যাতিত হয়েছেন। সীমাহীন অত্যাচার সহ্য করেছেন, কিন্তু তাতে দমে যাননি। হাল ছাড়েননি, পিছপা হননি। লক্ষ্যে অটল থেকে লড়াই করে গেছেন। শেষ পর্যন্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন তিনিই।
রাজনীতিতে শিষ্টাচার ও নৈতিকতার পরিচয় দিয়েছেন বেগম জিয়া। কখনো প্রতিপক্ষকে নোংরা বা কদর্য ভাষায় আক্রমণ করেননি। রাজনৈতিক শালীনতার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অশ্লীল ভাষা ও কুরুচির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন নীরব প্রতিবাদ।
বেগম জিয়া তাই বেঁচে থাকবেন। এদেশকে এগিয়ে নিতে হলে, বাংলাদেশকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে হলে বেগম জিয়ার আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। তার জীবন ও কর্ম থেকে আমাদের শিক্ষা নিতেই হবে। তিনি বাংলাদেশের আলোকবর্তিকা। তিনি আমাদের পথের দিশারি।