জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
থার্টি ফার্স্ট নাইট এখন আর সময়ের একটি সন্ধিক্ষণ নয়; এটি একটি সমাজের নৈতিক মানচিত্র পাঠ করার রাত। আতশবাজির শব্দে আমরা যতটা না নতুন বছরে ঢুকি, তার চেয়ে বেশি ঢুকে পড়ি নিজেদের আত্মপ্রবঞ্চনার গভীরে। এই রাত আমাদের শেখায়—বিশ্বাস এখানে নীতিনির্ধারক নয়, সুবিধানির্ভর এক আনুষঙ্গিক পরিচয়মাত্র।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে এই রাতের দৃশ্য আরও নির্মম। ইসলাম যেসব বিষয়কে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছে—মদ্যপান, জুয়া, অশ্লীলতা, অবাধ নারী–পুরুষ মেলামেশা, অপচয় ও সময়ের অবমাননা—থার্টি ফার্স্ট নাইটে সেগুলো নিষিদ্ধ থাকে না, বরং কেন্দ্রীয় আয়োজন হয়ে ওঠে। হারাম এখানে লুকোনো পাপ নয়; এটি আলোঝলমলে প্রদর্শনী। নিষেধাজ্ঞা নয়, নৈতিক সীমাই এখানে সবচেয়ে বড় শত্রু।
সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যটি হলো—এই সংস্কৃতির বাহক কোনো বিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক গোষ্ঠী নয়। বরং এর নেতৃত্ব দেয় তথাকথিত শিক্ষিত, প্রগতিশীল, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল শ্রেণি। যারা সারাবছর ধর্মকে “ব্যক্তিগত বিষয়” বলে সংজ্ঞায়িত করেন, তারাই এক রাতে প্রমাণ করেন—ব্যক্তিগত সুবিধা এলে ধর্ম আরও ছোট হয়ে যায়। “এক রাতেই বা কী আসে যায়?”—এই প্রশ্নটি নিছক অবহেলা নয়; এটি বিশ্বাসকে সাময়িক ছুটিতে পাঠানোর ঘোষণাপত্র। হারাম কি তাহলে সময়সূচিভিত্তিক? আল্লাহর নির্দেশ কি ক্যালেন্ডারের পাতায় ঝুলে থাকে?
এই রাতে যে ক্ষত তৈরি হয়, তা কোনো আইনি লঙ্ঘনের চেয়ে গভীর। এটি আত্মসংযমের পরাজয়। ফজরের আজানের সঙ্গে যখন পার্টির শব্দ মিশে যায়, তখন তা কেবল শব্দদূষণ নয়—তা সময়ের পবিত্রতার ওপর নগ্ন আঘাত। নতুন বছর শুরু হয় দায়িত্বহীন আনন্দ, অবশ বিবেক আর গুনাহকে “স্মৃতি” বানানোর মধ্য দিয়ে। এটিকে যদি নতুন সূচনা বলা হয়, তবে সেটি নৈতিক শূন্যতার ওপর দাঁড়ানো সূচনা।
রাষ্ট্র একে দেখে আইনশৃঙ্খলার ঝুঁকি হিসেবে, প্রশাসন দেখে নিয়ন্ত্রণের সমস্যা হিসেবে, মিডিয়া দেখে রেটিং ও কনটেন্ট হিসেবে, করপোরেট সংস্কৃতি দেখে বাজার হিসেবে। কিন্তু সমাজ হিসেবে আমরা স্বীকার করতে চাই না—এটি একটি গভীর আদর্শিক পতন। একদিকে সতর্কবার্তা, নৈতিক ভাষণ ও উপদেশ; অন্যদিকে কাউন্টডাউন শো, পার্টির লাইভ কাভারেজ, স্পনসরড উল্লাস। এই দ্বিমুখী অবস্থানই প্রজন্মকে শেখায়—নৈতিকতা বলা যায়, কিন্তু ভোগই শেষ কথা।
পরদিনের দৃশ্য আরও করুণ। যে হাত রাতে নিষিদ্ধে ব্যস্ত ছিল, সেই হাতেই লেখা হয় নৈতিকতার বাণী। যে মুখে ছিল ভোগের উচ্ছ্বাস, সেই মুখেই উচ্চারিত হয় নসিহত। এই দ্বিচারিতাই তরুণদের সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত করছে। তারা শিখছে—ধর্ম মানে বক্তব্য, জীবন মানে উপভোগ; বিশ্বাস মানে পরিচয়পত্র, আচরণ নয়।
ইসলাম আনন্দকে অস্বীকার করে না—কিন্তু ইসলাম এমন আনন্দ চায় না, যা আত্মসংযম ভেঙে দেয়, অন্যের অধিকার উপেক্ষা করে এবং স্রষ্টার নির্দেশকে অপ্রাসঙ্গিক বানায়। থার্টি ফার্স্ট নাইটের তথাকথিত উল্লাস তাই সংস্কৃতি নয়; এটি একটি অবস্থান। এটি নফসের পক্ষে দাঁড়ানোর নীরব ঘোষণা, বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এক রাতের বিদ্রোহ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা নতুন বছর উদযাপন করা না করা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আরও কঠিন, আরও অস্বস্তিকর—
আমরা কি এমন এক সমাজ হতে চাই, যেখানে বিশ্বাস কেবল বক্তৃতা আর স্ট্যাটাসে সীমাবদ্ধ,
নাকি এমন এক সমাজ, যেখানে আচরণই বিশ্বাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল?
আতশবাজির আলো নিভে গেলে যদি আমাদের বিবেকও আগের মতো অন্ধকারে ফিরে যায়, তবে থার্টি ফার্স্ট নাইট কোনো উৎসব নয়—এটি একটি সমাজের আত্মসমর্পণের বার্ষিক স্মারক।
লেখক ও কলামিস্ট, শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর