অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান
সময়টা ১৯৮১ সাল। স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। একজন গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসবেন—এমন কোনো আশা তখন কারো ছিল না। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির চেয়ারপারসন হন।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ভোরে সেনাপ্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বিচারপতি সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। এরপর দলীয় রাজনীতিতে বিচারপতি সাত্তার প্রভাবহীন হয়ে পড়েন।
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর গড়া রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতাকর্মীরা অনেকটাই দিশাহারা অবস্থায় পড়ে যান। বিএনপির নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আসে।
দলের নেতারা তখন দ্বিধাগ্রস্ত, তাঁদের মধ্যে কোন্দলও ছিল প্রবল। উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার তখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। কিন্তু রাজনীতির অঙ্গনে ‘দুর্বলচিত্তের ব্যক্তি’ হিসেবে পরিচিতি এবং ৭৮ বছর বয়সের কারণে দলের ভেতরেও তাঁর ওপর আস্থা ছিল না।
বিএনপির প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমদ তাঁর ‘চলমান ইতিহাস : জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’ বইয়ে লিখেছেন, সামরিক ও শাসকচক্রের কাছে সবচেয়ে বড় ভয়ের নাম ছিল খালেদা জিয়া।
কারণ রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে সে সময় খালেদা জিয়াই সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারতেন।
ওই সময় খালেদা জিয়াকে রাজনীতিমুখী করতে বিএনপির ভেতরে চাপ সৃষ্টি হয়। বিচারপতি সাত্তার রাজনীতি থেকে অবসর নিলে ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন এবং একই বছরের ১ মে দলের চেয়ারপারসন হিসেবে নিযুক্ত হন। সেই সময় থেকেই শুরু হয় বিএনপির সঙ্গে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা। এরপর টানা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে আসেন।
এর মধ্যেই সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে হটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ফলে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই খালেদা জিয়াকে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তখন থেকেই তাঁকে টানা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে এগোতে হয়েছে।
এ দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তাঁকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। এমনকি সত্তরোর্ধ্ব বয়সে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে জীবনের শেষ পর্যায়ে জেলেও দিন কাটাতে হয়েছে। রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নানা প্রশ্নে খালেদা জিয়ার এই অনড় অবস্থানই তাঁকে বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত করেছে। তিনি শুধু আপসহীনতার জন্যই নন, রাজনীতিতে তাঁর যে অসাধারণ ধৈর্য, তা তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন।
সময়টা ১৯৮৬ সাল। বাংলাদেশের তখন নতুন করে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করার কথা ছিল। জেনারেল এরশাদ একটি নির্বাচন আয়োজন করেন। সে সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা নির্বাচন বর্জন করবে। কারণ সবাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ— এরশাদের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী এরশাদের আয়োজিত ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়।
সবাই একসঙ্গে শপথ নিয়েছিল, এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাবে না; যারা যাবে তারা জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবে। অথচ মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে নির্বাচনে অংশ নেয়। এই সময়ই দেশের মানুষ স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে রাজনীতিতে খালেদা জিয়া কতটা অনমনীয় ও দৃঢ় অবস্থানের অধিকারী। পরবর্তীকালে গণ-আন্দোলনের মুখে পতন ঘটে তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের।
এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন খালেদা জিয়া; এবং তিনি সর্বমোট তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অংশগ্রহণ করেছেন। সেসব নির্বাচনের কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি পাঁচটি আসনে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনটি আসনে ভোটে অংশ নেন; এবং প্রতিটি নির্বাচনেই জয়লাভ করেন।
সাল ২০০৭। অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসে সেনা সমর্থিত সরকার। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। খালেদা জিয়ার একসময়ের উপ-প্রেস সচিব সৈয়দ আবদাল আহমেদ বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, তৎকালীন ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকার খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে বেগম জিয়া এ দেশের মানুষের কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দেশ ছেড়ে যাবেন না, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় শত নির্যাতন ও অত্যাচারের শিকার হয়েও তিনি দেশ ছাড়েননি।
পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে উচ্চ আদালতে অবৈধ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেয় বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন বর্জনের ফলে সংসদে বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি তখন চরম চাপে পড়ে যায়। খালেদা জিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হয় তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা ষড়যন্ত্রমূলক দুর্নীতির মামলাগুলো। সেই সময় বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়, অনেকেই গুম ও হত্যার শিকার হন। তা সত্ত্বেও খালেদা জিয়া সক্রিয়ভাবে বিএনপির হাল ধরে রাখেন। একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও বিএনপিকে ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা ছিলেন ঐক্যবদ্ধ।
খালেদা জিয়া যখন রাজনৈতিকভাবে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছিলেন, ঠিক ২০১৫ সালের দিকে তাঁর জীবনে নেমে আসে এক বড় ধাক্কা। স্বামীর পর এ দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পথে তাঁকে হারাতে হয় তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে। যদি ২০০৮ সালে সেদিন তিনি দেশ ছেড়ে চলে যেতেন, হয়তো তাঁর এই সন্তানের মৃত্যু ঘটত না। কিন্তু সেই সময়েও দেশের প্রয়োজনে তিনি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।
আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ষড়যন্ত্রমূলক জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় আদালত তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন, যা পরে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে দায়ের করা দুর্নীতির আরেকটি মামলায়ও তাঁকে কারাদণ্ড দেয় তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার।
কারাগারে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন কারাগারে সুচিকিৎসার অভাবে তাঁর শরীরে নানা জটিল রোগ বাসা বাঁধে। করোনাকালে গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নির্বাহী আদেশে বিশেষ শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। কারামুক্তির পরও অসুস্থ খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দেয়নি তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার। দলের চেয়ারপারসন পদে বহাল থাকলেও সেই সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। দলের মূল নেতৃত্ব লন্ডন থেকে দিতে শুরু করেন তাঁর বড় ছেলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এমন কোনো নির্যাতন নেই, যা আওয়ামী লীগ খালেদা জিয়াকে করেনি। স্বামীর পর হারালেন সন্তানকে, কাঁধে চাপানো হলো একের পর এক মামলা। দলের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম ও হত্যার শিকার হন। বড় ছেলেকেও নানা কায়দায় রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়। উপরন্তু আওয়ামী লীগের সেই খুনি শাসক শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তামাশা ছিল নিয়মিত। এত অসীম যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি এ দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে চেয়েছিলেন, দেশজুড়ে শান্তি কামনা করেছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে সব দণ্ড থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগের দিন, ৫ আগস্ট, যেদিন হাসিনা দেশ ছেড়ে পালান, সেদিনই হাসপাতালে থাকা অবস্থায় নিজের কেবিন থেকে দেশরক্ষার আহবান জানিয়ে ভিডিও বার্তা দেন খালেদা জিয়া।
মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারাগারে রেখে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে। অসংখ্য নেতাকর্মী গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন। তবু সেই দুঃসহ অন্ধকার সময়েও তিনি উচ্চারণ করেছিলেন আশার কথা—‘যারা দেশকে ভালোবাসে, তারা কখনো দেশের ক্ষতি করতে পারে না।’ জীবনের শেষ মুহূর্তেও দেশের মানুষের উদ্দেশে তিনি রেখে গেছেন এক মহান আহবান—‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়; ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’
এই ছিল তাঁর রাজনীতি। ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসা, সহিংসতার বিপরীতে শান্তি এবং প্রতিহিংসার বিপরীতে ঐক্যের দর্শন। খালেদা জিয়ার এই আদর্শ, মানুষের প্রতি ও দেশের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এ দেশকে স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ রাখতে হলে ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়