মো. আলাউদ্দিন | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১১টির মধ্যে পাঁচ কোম্পানি অধিক ঝুঁকিতে, পিপিএ শেষ—বন্ধ প্ল্যান্ট, আদায় অযোগ্য পাওনায় উদ্বেগ
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা এখন আর শুধু দুর্বলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তাদের ব্যবসার ধারাবাহিকতা ও ভবিষ্যৎ টিকে থাকা নিয়েই তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। সরকারি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) মেয়াদ শেষ হওয়া, নতুন চুক্তি না হওয়া, উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ থাকা, আদায় অযোগ্য পাওনা বৃদ্ধি এবং সম্পদের অতিমূল্যায়নের মতো নানা সংকটে খাতটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হালনাগাদ নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১১টি বিদ্যুৎ কোম্পানির মধ্যে অন্তত পাঁচটির ক্ষেত্রে এসব ঝুঁকি প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে পিপিএ শেষ হয়ে যাওয়ার পর প্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে, অথচ সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় প্রভিশন যথাযথভাবে করা হয়নি।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি জানিয়েছে, চুক্তি ও আর্থিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই কোম্পানিগুলোকে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ক্রয় চুক্তি ছাড়া বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ টেকসই নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বলেন, “ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় বেশি, অন্যদিকে গ্যাস সংকট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এ অবস্থায় পিপিএ শেষ হওয়া প্ল্যান্ট চালু রাখা কঠিন।” তিনি আরও বলেন, অডিট রিপোর্টে যদি ‘গোয়িং কনসার্ন’ ঝুঁকি থাকে, তা বিনিয়োগকারীদের জানানো বাধ্যতামূলক।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি আর্থিক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানিতে। বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে প্রায় ৪ হাজার ৭১৫ কোটি টাকার ফরেন এক্সচেঞ্জ ক্ষতি মূলধনে যুক্ত করা হয়েছে, ২৭ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকার প্রপার্টি, প্ল্যান্ট ও ইকুইপমেন্ট (পিপিই) যথাযথ যাচাই ছাড়াই দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি বিতর্কিত পাওনার বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন না রাখায় প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল হয়েছে। টানা লোকসানের কারণে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ৮ ও ৫ টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে এবং বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে অবস্থান করছে।
এ বিষয়ে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক মো. মুনিরুজ্জামান বলেন, ভেন্ডর চুক্তিজনিত সমস্যার সমাধান প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং সুদ ব্যয় যাচাই করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে।
ডেসকোর ক্ষেত্রেও আদায় অযোগ্য পাওনার চিত্র উদ্বেগজনক। কোম্পানির মোট ৫৬০ কোটি টাকার পাওনার মধ্যে প্রায় ৩১১ কোটি টাকা আদায় অনিশ্চিত হলেও প্রভিশন রাখা হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। পাশাপাশি বাতিল হওয়া গুলশান সাবস্টেশন প্রকল্প এখনো চলমান নির্মাণ প্রকল্প (সিডব্লিউআইপি) হিসেবে দেখানো হচ্ছে। বড় অঙ্কের লোকসানের কারণে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে কোম্পানিটি কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। ডেসকোর কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, বিহারি ক্যাম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাবদ ২৬৩ কোটি টাকার বকেয়া নিয়ে মামলা চলমান থাকায় তা প্রভিশনে নেওয়া হয়নি।
বারাকা পাওয়ার নিজস্ব সহযোগী প্রতিষ্ঠানে ১৫৫ কোটি টাকার বেশি জামানতহীন ঋণ দিয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জের ৫১ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পিপিএ শেষ হওয়ায় ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে প্ল্যান্টটি বন্ধ রয়েছে, তবে সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম আহমেদ চৌধুরী জানান, সরকারের হঠাৎ চুক্তি স্থগিতের কারণেই প্ল্যান্টটি বন্ধ রাখতে হয়েছে।
খুলনা পাওয়ারের ইউনিট-২ ও ইউনিট-৩-এর পিপিএ ২০২৪ সালে শেষ হয়েছে। আগস্ট থেকে প্ল্যান্ট পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সম্পদের মূল্যহ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। টানা পাঁচ বছর লোকসানের কারণে কোম্পানিটিও বর্তমানে জেড ক্যাটাগরিতে রয়েছে।
ডরিন পাওয়ারের তিনটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পিপিএ শেষ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি গ্র্যাচুইটি ও দেনা-পাওনার হিসাব নিয়েও নিরীক্ষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “সরকারি ক্রয় চুক্তির অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনার অভাব বিদ্যুৎ খাতকে সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।” তিনি মনে করেন, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চুক্তি নবায়ন ও বাজারমুখী উদ্যোগ জরুরি। এতে কোম্পানিগুলোর টেকসই অবস্থান তৈরি হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাও পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।